‘ডেগ বাসন ভাইসা গেছেগি, অকন কিতাত রাইন্ধা খাইমু’

মিঠু দাস জয়;
  • প্রকাশিত: ৩১ মে ২০২৪, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ২ সপ্তাহ আগে

বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা হোসনে আরা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে কথা হয় সিলেট ডায়রির। তিনি বলেন, ‘তিন দিন থেকে ভাত না খেয়ে চিড়া খেয়ে বেঁচে আছি সন্তানদের নিয়ে। আমি পরের বাড়িত কাম করিয়া ধান জমাই চলাম। ওউ ধানটা লইয়া গেছেগি’।

তিনি আরও বলেন- ‘আমরা মা পুত তিনজনে অসহায় অবস্থায় আশ্রয়কেন্দ্রত আইয়া আশ্রয় লইলাম। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘরের সবতা ভাসাইয়া লইয়া গেছেগি। রাইন্ধা যে খাইতাম একটা ডেগ বাসন কুন্তাই নাই, সব ভাইসা গেছেগি। অকন কিতা খাইয়া বাঁচমু, বাড়িত গিয়া কিতাত রাইন্ধা খাইমু?’

হোসনে আরা ছাড়াও দশগাঁও নওয়াগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তদের অনেকেই সিলেট ডায়রির সঙ্গে কথা বলেন।

গুচ্ছগ্রামের জহির আলী বলেন, ‘বর্তমানে আমার ঘরের ভিতরে আছে কমর পানি, একটা নৌকাও যে পাইমু কেউর কাছে এই আশা নাই। যার আছে তার সবতাই আছে, আর যার নাই তার কুন্তাই নাই। আপাতত জানখান বাঁচাইয়া একটা নৌকা মিলাইয়া আশ্রয়কেন্দ্রত আইছি’।

আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন মুদি দোকানি মুজিবুর রহমান, যার অধিকাংশ মালামাল বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। অল্প কিছু জিনিসপত্র রক্ষা পায়, সেগুলো নিয়েই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। তিনি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন। তিনিসহ যারাই বনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবার পুনর্বাসনের দাবি জানান তিনি।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, পানিবন্দি হয়ে ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৬টি কেন্দ্রে ২৩৫৬ জন নারী, পুরুষ, শিশুসহ ৬৪৫টি গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়াও বন্যাদুর্গত বিপুলসংখ্যক মানুষ নিকটস্থ আত্মীয়-স্বজনের নিরাপদ উঁচু স্থাপনাতেও আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলায় ৩৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়ে ৪২ হাজার ৯০০টি পরিবার পানিবন্দি আছে। ১৬৬০ হেক্টর ফসলি জমি ডুবে গেছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচাপাকা রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে নৌকাই ভরসা করছেন বন্যার্তরা।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। উপজেলা কৃষি অফিসার রায়হান পারভেজ রনি, উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. জামাল খান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শীর্ষেন্দু পুরকায়স্থ সমন্বয়ে গঠিত টিম উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের রাস্তাঘাট, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্টের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ করছেন।

এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারত থেকে নেমে আসা উজানের ঢলে সিলেটের ৫ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে বিশ্বনাথ, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে। তবে এ তিনটিতে বন্যা পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ রূপ নেয়নি।

সীমান্ত এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও বাড়ছে শহর ও নিম্নাঞ্চলে। অকাল বন্যায় এরই মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে সিলেট নগরীর কিছু অংশসহ সাতটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৬ লাখ ৩৪ হাজার ২০২ জন মানুষ। আক্রান্ত হয়েছে ৭ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন। বন্যা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ৫৪৭টি। এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন ৩ হাজার ৭৩৯ জন।

বিষয়টি সিলেট ডায়রিকে নিশ্চিত করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান। তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আমাদের মেডিকেল টিম কাজ করছে। অন্তত একজন করে হলেও ডাক্তার প্রত্যেকটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন এবং রোগে আক্রান্তদের চিহ্নিত করে সেবা দিচ্ছেন।

ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগে তিনি বলেন, এই বিষয়টি আমার দৃষ্টিতে এসেছে, আশা করি, শীঘ্রই সবাই ত্রাণসামগ্রী পেয়ে যাবেন। আমরা বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে সমস্যা খুঁজে বের করছি এবং সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে- সিলেটে গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বিশ্বনাথ, বিয়ানীবাজারে ও গোলাপগঞ্জের একাধিক এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ডাইক ভেঙে বিয়ানীবাজার উপজেলার একাধিক স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। গত বুধবার বিকেল থেকে এসব উপজেলায় পানি বাড়তে শুরু করে। অনেকের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। ভেসে যায় গবাদিপশু ও পুকুর-খামারের মাছ।

এসব উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সিলেটের নদ-নদীর পানি জেলার পাঁচটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২টি পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে। তবে অনেকের অভিযোগ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানো কোনো সহযোগিতা বা ত্রাণ আসেনি তাদের কাছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, বেশ কয়েকটি উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। বিকেল ৩টা পর্যন্ত সিলেটের নদ-নদীগুলোর তিনটি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক দুর্গত এলাকাগুলোর খোঁজখবর নিচ্ছি। ভারতের মেঘালয় রাজ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২শ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন যা ছিল সাড়ে ৬শ মিমি। ভারতে বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এদিকে, সিলেট মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নগরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সুরমা নদীর পানি বেড়ে এ জলাব্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার (৩১ মে) সকাল থেকে সুরমা নদীর পানি ঢুকতে শুরু করে নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উপশহর সি-ব্লক, ডি-ব্লক ও ই-ব্লক একাংশ, যতরপুর, তোপখানা, মাছিমপুর, সোবহানীঘাট, তালতলা ও শেখঘাট ও কাজিরবাজার এলাকায়। সকালে তালতলা ও মেন্দিবাগ-মাছিমপুর সড়কে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক দুটিতে প্রায় হাঁটু পানি জমে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই পানি ঢুকে তালতলাস্থ সিলেট ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ে। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. বেলাল হোসেন বলেন, বন্যার পানি ওঠার কারণে এ স্টেশন থেকে মেশিনারিজ ২৭নং ওয়ার্ডের আলমপুর স্টেশনে নিয়ে রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকা উপশহর, যতরপুর, তোপখানা, মাছিমপুর ও সোবহানীঘাট এলাকার সড়ক ও বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও দোকানপাট, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদে পানি প্রবেশ করে। এতে বিপাকে পড়েন নগরের বাসিন্দারা। অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাসায় আশ্রয় নেন।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি