শ্রীমঙ্গলে কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে সিলিকা বালু উত্তোলন

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি;
  • প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ৮:২৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চলছে কোটি টাকার অবৈধ সিলিকা বালুর ব্যবসা। কৃষি জমিতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে সিলিকা বালু উত্তোলন করছে, এখন ও মামলা অবস্থা সিলিকা বালু উত্তোলন হচ্ছে। এলাকার ফসলি জমি নষ্ট করে এসব বালু তোলায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করেছে। একেকটি গর্ত ৫০ থেকে ১৫০ ফুট গভীর হয়। প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ বাধা দিতে সাহস পায় না। বাধা দিতে গেলে উল্টো হয়রানি শিকার হতে হয়। এই চক্র খুবই শক্তিশালী। তিন ইউনিয়নের ১৪-১৫টি গ্রামের কয়েকশ’ পরিবার ও এলাকাবাসী। এতে তেল-গ্যাস পাইপের জাতীয় গ্রিড লাইন পড়েছে হুমকির মুখে। যে কোনো সময় বা ভূমিকম্পে এসব এলাকা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, মাটির নিচের দিকে নামে, তা ছাড়া ফসল ভালো করে ফলে না, সবদিকেই ক্ষতি। দিনরাতে প্রচুর বালুর গাড়িগুলো আসতেছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে, এগুলোর সরকারি কোনো অনুমতি নেই, কোনো লিজ নেই, রাজস্ব নেই, কোনো কিছু নেই। অথচ বলব যে এগুলা প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে সিলিকা বালু আসতেছে। অবৈধ সিলিকা বালু উত্তলনের সাথে জড়িত ফেরদৌস, নানু, কাউছার, ফয়েজ, কবির মোল্লা, দুদু, কদর আলী, আসলাম, এসব বালু ব্যবসায়ীরা বহু দিন ধরে ভূনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছে। এখন তাদের আঙুল ফুলে কলা গাছ। শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর কোনো অনুমতি তো নাই। তারপরও সিলিকা বালু তোলে। এ ব্যাপারে অভিযোগ করে আর কি হবে, অভিযোগ করে কোনো ফায়দা নাই। এই ব্যাপারে তো কোনো উদ্যোগ নেই, কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না। পরিবেশের ক্ষয়-ক্ষতির কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না।

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলাতে ২৯টি সিলিকা বালু ছড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কর্তৃক হাইকোর্টে এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে ইজারা বন্দোবস্ততে স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। পরে ২০১৮ সালে আদালত এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট (ইআইএ) প্রাপ্তিসাপেক্ষে ছড়ার ইজারার অনুমোদন দিতে বলা হয়। পরে ২০২১ সালের ২৫ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক মৌলভীবাজার কার্যালয় থেকে ১৪২৮ বাংলা সনের বৈশাখ মাস হতে ১৪২৯ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র ২ বছরের জন্য ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে শ্রীমঙ্গল উপজেলাতে ২৯টি ছড়ার ইজারা বন্দোবস্ত পান ইজারাদাররা। ওই ২৯টি ছড়ার ইজারাদাররা শুধু ২৫ শতাংশ সিকিউরিটির টাকা জমা দিয়ে পরিবেশ ছাড়পত্র ‘ইআইএ’ সংগ্রহের জটিলতার অজুহাতে দেখিয়ে বিগত দুই বছর রাজস্বের বাকি টাকা জমা না দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছেন। এতে শুধু বিগত দুই বছরে ভ্যাট, ট্যাক্স ও ইজারা মূল্যসহ এই বালুমহাল থেকে ইজারাদাররা ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৫৬২ টাকা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। বিগত ২০১৬ সাল থেকে হিসাব করলে সরকার এ খাত থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আহরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত বাকি কোনো ইজারাদার ‘ইআইএ’ জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার তাগিদ অনুভব করছেন না এবং তারা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছেন। তারা পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না। বর্তমানে ১৪৩০ বাংলা সন চলমান কিন্তু ১৪২৯ বাংলা সনে পূর্বের ওই দরপত্রের ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ নতুন ইজারা দরপত্র কেনো আহ্বান করছে না তা বোধগম্য নয়? ছোট বড় ২৯টি ছড়ার মধ্যে ৬টি ছড়া বৈধতা রয়েছে বাকি ২২টি ছড়ায় বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত সরকার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু দিন আগে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা করে সেই সাংবাদিকে বেদম মারপিট করে। তিনি সাংবাদিক তানভীর ইসলাম কাওছার। বাংলাদেশ পোস্টের মৌলভীবাজার প্রতিনিধি।(গত ৪ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নে ভুনবীর চৌমুহনায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় আহত সাংবাদিক এর খালা খুশ ভানু বেগম বাদী হয়ে একই ইউনিয়নের চিহ্নিত বালু দস্যু কাওছার, ফেরদৌস, কবির মোল্লা, নানু, দুদু, ফয়েজ ও আসলামের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করে শ্রীমঙ্গল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এখনও মামলা চলমান। কয়েকজন আসামি জেলহাজতে, বাকিরা জামিনে আছে। কৃষক মো. হাসান মিয়া বলেন, সরকার বালু তোলার অনুমতি দেয়নি, তবে কিভাবে বালু তুলে আনে। জমি থেকে বালু তুলে, সরকারি কর্মকর্তা নাই, দেখেও না, চেকও করে না, তারা বসে রইছে চেয়ারে। এই দেশের সম্পদ যদি আমরা ধ্বংস করি, তাইলে তো আমাদেরই সর্বনাশ। জমি থেকে বালু তুললে তো এই জমির মধ্যে আর কোনো ফলন হবে না।

মো. ইরা মিয়া বলেন, ভুনবীর এর দিকে যদি আপনি দেখেন, তো ভয় পাইবেন। যে রকম গর্ত হইছে, অন্তত মনে করেন ১২ থেকে ১৪ একর জায়গা হইব, বালু উত্তোলন করে এই জায়গা একেবারে অযোগ্য করে দিছে তারা। এতে তো ক্ষতি হয়। সিলিকা বালু উত্তোলন করলে জায়গা গভীর হয়ে যায়, জায়গাও নষ্ট হয়ে যায়, এ জমিগুলোতে কোনো ফসল করা যাবে না।

কৃষক মো. হাসান মিয়া বলেন, জমি থেকে বালু তুলে, সরকারি কর্মকর্তা নাই, দেখেও না, চেকও করে না, তারা বসে রইছে চেয়ারে। যেমন মনে করেন মাটির নিচের দিকে নামে, তা ছাড়া আপনার ফসল ভালো করে ফলে না, সবদিকেই ক্ষতি। কোনো অনুমতি তো নাই। এটা নিয়ে তো অনেক কিছু হয়, কিন্তু পরে আবার ঠিকই তারা বালু তোলে। জমি থেকে বালু তুললে তো এই জমির মধ্যে আর কোনো ফলন হবে না। এ ব্যাপারে অভিযোগ করে আর কি হবে, অভিযোগ করে কোনো ফায়দা নাই। এই ব্যাপারে তো কোনো উদ্যোগ নাই, কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না।

সিলিকা বালুর ব্যবসা সিন্ডিকের প্রধান অভিযুক্ত কাওছার বলেন, এগুলো কে করে আমি তো জানি না। আগে দেখেন, কোনো কিছু পান কি না। আমি তো জানি না। আমার সম্পর্কে এই অভিযোগ কে দিয়েছে, অভিযোগকারী কে। আমার ভালোবাসার লোক আছে, খারাপ করার লোকও থাকতে পারে। আমার গাড়ি-ঘোড়া চলে আর মাঝেমধ্যে আমি এলাকার কোনো কাজকাম থাকলে তাদের দিয়ে দেই আরকি। আমাকে নিয়ে দেখবেন যে আমি কোনো জায়গায় বালু উত্তোলন করি। এখানে আপনি আমাকে সরাসরি পাবেন। আমার বাড়ি ভুনবীর ইউনিয়নেই, আমাকে ফোন দিলে আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করব।

অবৈধ বালু ব্যবসায়ী কবির মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি বালু তুলি না। এখানে মেশিন দিয়ে বালু তোলা হয় না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সমরু বলেন, দিন রাতে প্রচুর বালুর গাড়িগুলো আসতেছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। এগুলোর সরকারি কোনো অনুমতি নেই, কোনো লিজ নেই, রাজস্ব নেই, কোনো কিছু নেই। অথচ আমি বলব যে এগুলো প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে আসতেছে। আবার আসতেছে ভুনবীর চৌমুহনায়, সিলিকা বালুর বড় বড় ডিল করা, এসব কি প্রশাসন দেখে না, তাদের নজরে আসে না। তাহলে হঠাৎ একদিন একটা অভিযান চালালো, দৌঁড়ানি দিল, এরপর ৩ থেকে ৪ দিন পর দেখা যায় আবার সব আগের মতো। তারা বলে না না সব ঠিক আছে। এতে বুঝা গেল যে যে কোনোভাবে প্রশাসনকে তারা ম্যানেজ করছে। এ কাজে আমরা ভীষণভাবে জর্জরিত। এতে দেশের ক্ষতি, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, সব দিক দিয়েই ক্ষতি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা সমস্বয়কারী আসম সালেহ সোহেল বলেন, একটা বলে থাকি যে, এই যে ভুনবীর আশপাশে যে ইউনিয়নগুলো আছে শ্রীমঙ্গলের, সেখানে যে সিলিকা বালু আছে, সেটা তো দামি বালু এবং সেই বালু উত্তোলনের ব্যাপারে সরকারের কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু সরকারের সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কিভাবে সেখানে বালু উত্তোলন করা হয়, প্রশাসনের কি সেখানে কোনো দায়িত্ব নেই? আমরা মনে করি, আমরা পরিবেশ কর্মীরা এত কথা বলছি, যে এই বালুটি হচ্ছে সরকারি বালু। সরকার কখনো লিজ দিচ্ছে না। আর যদি কোথাও লিজ দিয়ে থাকে সরকার, আমরা বলছি যে পুরো দমে বন্ধ করে দিতে হবে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রীমঙ্গল সন্দ্বীপ তালুকদার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমরা প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিব। বিষয়টা আমাদের নজরে আসছে।

প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কৃষিজমিতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে- এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বলেন, আমাদের কাছে যে নিউজ ছিল রেগুলার মোবাইল কোর্টে জরিমানা করা হচ্ছে। দরকার হলে আজও মোবাইল কোর্ট পাঠাবো, আইনগত ব্যবস্থা নেব।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম বলেন, এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে, বিষয়টি দেখছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি