কমিটি ঘোষণার ১০ দিনের মাথায় খুনে জড়ালো ছাত্রলীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক ;
  • প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২১, ১১:০০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১ মাস আগে

গেলো ১২ অক্টোবর সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কমিটি ঘোষণার ১০ দিনের মাথায়ই খুনের ঘটনার সাথে জড়ালো ছাত্রলীগের নাম। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে কাটাকাটির মতো তুচ্ছ ঘটনার জেরেই প্রাণ গেছে এক কিশোরের। এই খুনের সাথে জড়িত সন্দেহে উঠে এসেছে এক ছাত্রলীগকর্মীর নাম।

ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায়ও ঘটছে খুনের ঘটনা। আর এসব খুনের ঘটনায় বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে ‘ছুরি-চাকু’। এমন অবস্থায় সিলেটের ছাত্র রাজনীতি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। একই সাথে বাড়ছে নেতৃত্ব সংকটও। অন্যদিকে খুনোখুনি আর রক্তের হোলি খেলার ভয়ে প্রকৃত ছাত্ররা আসছেন না রাজনীতিতে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা কলেজ গেটের সামনে ছুরিকাঘাতে আরিফুল ইসলাম রাহাত (১৮) নামে এক ছাত্রলীগ নেতা খুন হন। তিনি দক্ষিণ সুরমার তেতলি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের উপ-ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। এর আগেও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নিজ দলের কর্মীদের হাতে খুন হন।

তবে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি সভাপতি নাজমুল ইসলাম বলছেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ খুনোখুনির রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আর দক্ষিণ সুরমায় যে ঘটনা ঘটেছে তা অবশ্যই দুঃখজনক। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ আমরা চাই না কোন মায়ের বুকই খালি হউক। সেজন্য দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাই। একই সাথে বর্তমান কিশোর ও যুবকরা যাতে চাইলেই হুটহাট ‘ছুরি বা নাইফ’ না কিনতে পারে সেজন্য প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। আর যদি কারও কাছে ‘নাইফ বা ছুরি’ পাওয়া যায় তাহলে তাকে অস্ত্র আইন কিংবা অন্য যে কোন আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার দাবিও জানান ছাত্রলীগের এ নেতা।

তিনি আরও বলেন, আমাদের কমিটি মাত্রই হয়েছে। আমরা চেষ্টা করবো ছাত্র রাজনীতিকে ক্যাম্পাসমূখী করার। গলি কিংবা মহল্লায় বসে যারা নিজেদের ছাত্রলীগ দাবি করা ঠিক নয়। কারণ ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাত্ররাই করবে।

তবে ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাত্ররাই করার কথা থাকলেও সিলেটে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। এখানে ছাত্রলীগে ছাত্রদের চাইতে অছাত্রদের প্রভাবই বেশি। মূলত গ্রুপ কেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। কারণ গ্রুপ বড় করতে গিয়ে অনেক সময় কে ছাত্র কে ছাত্র না এসব না দেখেই নিজেদের সাথে যুক্ত করছেন। এমন অবস্থায় ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে মারামারি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ঘটছে খুনের ঘটনাও।

২০১০ সালের ১২ জুলাই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট-কালিবাড়ি রোডের মদিনা মার্কেট অংশে ইজিবাইকের (টমটম) একটি নতুন স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা ইমরান আহমদ ও গোলজার আহমদ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল্লাহ ওরফে কচি নিহত হন। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের পার্থ-সবুজ গ্রুপের সাথে অঞ্জন-উত্তম গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী সুমন চন্দ্র দাস।

২০১৫ সালের ১২ আগস্ট দুপুর আড়াইটায় সিলেট মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ দলের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার সিলাম তেলিপাড়া গ্রামের আকলিস মিয়া আরকানের ছেলে আব্দুল আলী (১৯)। তিনি ছাত্রলীগ বিধান সাহা গ্রুপের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ের শিকার হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান।

২০১৭ সালের ১৭ জুলাই দুপুরে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের ১০২ নং শ্রেণিকক্ষের ভিতরে নিজেদের অবস্থানে পাইপগানের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল গ্রুপের সমর্থিত কর্মী খালেদ আহমদ লিটু। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি রাত পৌনে ৯টার দিকে টিলাগড় পয়েন্টে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা তানিম আহমদ খান। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর সিলেট নগরের টিলাগড়ে ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ (২২) কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে খুন হন হুসাইন আল জাহিদ নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী। নগরের উপশহরে তাকে ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ওসমানী হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। সে সিলেট নগরের সীমান্তিক স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এই তালিকায় সবশেষ যুক্ত হলেন আরিফুল ইসলাম রাহাত। তিনি তেলিহাওর গ্রুপের অনুসারী ছিলেন।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা চাইছি দলটাকে ঢেলে সাজাতে। খুনের রাজনীতি কেউ চায় না। তবুও এসব ঘটছে। কিন্তু ছাত্রলীগ বলেন আর যুবলীগ বলেন তারা আওয়ামী লীগেরই অংশ। তাই আমরা তাদের নিয়ে বসবো। আগামীর পরিকল্পনা গ্রহণ করবো। আমরা চাই রাজনীতি হবে দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে। এখানে কোন মারামারি-হানাহানি থাকবে না।

আর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের বলেন, ‘নাইফ বা ছুরি’ যারা বিক্রি করেন তারা গ্রাহকদের একটি ডাটা সংরক্ষণ করতে পারেন। কে কোন দরকারে এসব জিনিস কিনতে চান তাও উল্লেখ থাকবে। কিশোর ও কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা যাতে এসব কিনতে না পারে সেজন্য তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। যেমন ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কিছু ওষুধ বিক্রি করা হয় না। এমনভাবে এসব দোকানেও করতে হবে। এজন্য পুলিশ, জেলা প্রশাসন, মেয়র ও স্থানীয় নাগরিকরা এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে ব্যবসায়ীদেরও। তাহলে হয়তো ‘ছুরি বা নাইফের’ ব্যবহার কমানো যাবে। কমে আসবে এসব জিনিস দিয়ে করা অপরাধগুলোও।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার কারণে আড্ডার একটা সুযোগ হয়েছে। তবে আমাদের পেট্রোলিং টিম এসব নিয়ে কাজ করছে। কোথাও সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এটি আরও বাড়ানো হবে।

রাহাতের হত্যাকারী চিহিৃত, তাকে ধরতে অভিযান চলছে জানিয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, নিহতের পরিবার মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে রাহাতের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

এদিকে, আরিফুল ইসলাম রাহাত হত্যার ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কমিটি আগামী তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া আগামী ৪ দিন কলেজে ক্লাস বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ