কেটে গেল বছর, শুরু হয়নি এমসি ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের বিচারকার্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ;
  • প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৪ সপ্তাহ আগে

দিনের হিসেবে সিলেটের মুরারীচাঁদ (এমসি) কলেজের বয়স ৪৭ হাজার ২শ দিন। এই দীর্ঘ সময়ে কত গল্প জমা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপীঠের ঝুলিতে। বন্দরবাজার থেকে যাত্রা শুরু করে ছবির মতো টিলার গায়ে স্থায়ী হওয়ার গল্প। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়, বাংলাদেশের দুই সফল অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ কত খ্যাতিমানের জীবন গড়ে দেওয়ার গল্প লিখা আছে এর গায়ে, গাছের ছায়ায়, পুকুরপাড়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভারতের কোকিল’ সরোজিনী নাইডুসহ কত গুণিজনের পদচারণা, কত সুখস্মৃতি। তবু এর মাঝ থেকে দুটো দিনকে একদমই ভুলে যেতে চাইবে সিলেটের প্রতীক হয়ে উঠা শিক্ষায়তনটি। ১৮৯৭ সালের মহাভূমিকম্প যতটা ধাক্কা দিতে পারেনি এরচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছে এ দুটো দিন।

শত বছর আগের ভূমিকম্পে তো কেবল ক্ষতি হয়েছিলো ভবন আর স্থাপনার কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের দুটো ধাক্কায় টলে উঠে দীর্ঘ দিনে গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি। দুঃস্বপ্নের সে দিনগুলোর একটি এসেছিলো ২০১২ সালের ৮ জুলাই। সেদিন সন্ধ্যায় ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষেরজের ধরে কলেজের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাসে আগুন দেওয়া হয়।

সে আগুনে পুড়ে যাওয়া ছাত্রাবাস অশ্রু ঝরিয়েছিলো সে সময়কার শিক্ষামন্ত্রী ও এমসি কলেজের এক কালের শিক্ষার্থী নূরুল ইসলামের চোখ থেকেও। সে দিনের মতো ঘোর কালো আরও একটি সন্ধ্যা এসেছিলো এক বছর আগের ঠিক এমন দিনে। এমসি কলেজের গায়ে কলঙ্কের দগদগে ঘা হয়ে এখনও ভাসছে দিনটি।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বিকেলে দক্ষিণ সুরমার এক যুবক তার নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলেন। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান করছিলেন তারা। এ সময় কয়েকজন যুবক তাদের ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে তাদের জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে তারা।

পরে জানা গিয়েছিলো ধর্ষণকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। করোনাপরিস্থিতির কারণে ছাত্রাবাস বন্ধ থাকার কথা থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে তারা ছাত্রাবাস দখলে রেখেছিলেন।

ঘটনার রাতেই নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। পুলিশও আরেকটি মামলা করেছিলো তল্লাশির পর ছাত্রাবাস অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায়। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ও র‌্যাব। ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আট আসামিই বর্তমানে কারাগারে আছেন।

অভিযোগপত্রের উপর শুনানি শুরু হয় চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি। ২৪ জানুয়ারি আদালতে আলাদা দুটি মামলার বিচারকাজ একসঙ্গে শুরু করার আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে বিচারক আবেদন খারিজ করে দেন। এরপরই বাদীপক্ষ মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম একই আদালতে সম্পন্নের জন্য উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল বেঞ্চে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানি শেষে আদালত মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের আদেশে গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলবে একসঙ্গে একই আদালতে। এজন্য নতুন করে মামলার অভিযোগও গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। খুব সম্ভব মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ১৩ অক্টোবরই নতুন করে অভিযোগ গঠন করা হতে পারে।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটো মামলাই এখন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্নের লক্ষ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যুনালে মামলা দুটি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় এ সংক্রান্ত জেলা কমিটি। এজন্য গত ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ