এ শহর আমাকে টানে : পীর হাবিবুর রহমান

পীর হাবিবুর রহমান;
  • প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২১, ১১:০৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১ মাস আগে

কত সহস্রবার আমি পূর্বপুরুষের জন্মের সুনামগন্জ শহরের সব কটি পথ হেঁটেছি। কতরাত বিলম্ব করে ঘরে ফিরেছি। কখনো রাজনীতি কখনোবা আড্ডায় ডুবেছি।বাংলোঘর থেকে কত জায়গায় আড্ডার স্মৃতি বহন করেছি। তারুন্যের প্রথম প্রহর থেকে সবচেয়ে বেশী আড্ডায় মেতেছি উকিলপাড়ায় শীতেশ আর মনিরের চায়ের ষ্টলে।আর সন্ধ্যায় শহরের বুকচিরে বহমান সুরমা পাড়ে।জলের সাথে, জোছনার সাথে, বৃষ্টির সাথেই জীবনের গভীর প্রেমের পাঠ! যা আজও ছিন্ন হয়নি।

আরব সাগরের তীরে মুম্বাই শহরের রেডিসন ব্লু হোটেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আজ বড় নস্টালজিক আমি।দেশ বিদেশের সকল প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ছে।সবার মুখ ভাসছে।আমার আবেগ অনুভূতি দিয়ে প্রিয় শহরের নাম দিয়েছিলাম জল জোছনার শহর।কবিতা ও গানের শহর।আড্ডা, প্রেম ও ভালোবাসার শহর।এ শহর আমাকে টানে,ডাকে,জড়িয়ে রাখে।সেই ছোট্ট ছিমছাম গোছানো শহর অনেক বদলেছে।কেবল ভালোবাসাটা বদলায়নি,মনটা বদলে যায়নি।আবেগটা মরে যায়নি!সারল্যতা হারায়নি।বিশ্বাসের কবর হয়নি!

কত অগ্রজ অনুজের সাথে সুন্দর স্মৃতিময় সুখময় প্রানবন্ত আড্ডার ছবি ভাসে।তাদের কথা মনে পড়ে।কেউ কেউ অকালে হারিয়ে গেছেন।আমার স্কুল কলেজের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে।নানা মত তবু অমলিন আত্নিক সম্পর্ক।ভাটা পড়েনি।একটি অসাম্প্রদায়িক শহর।ধর্মের উর্ধ্বে আমাদের সব সম্পর্ক কতইনা গভীর।এক সময় শীত নামলে যাত্রাপালা,নাটক,গান,কবিয়াল লড়াই,বাউলের আসর নিয়মিত হতো।দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা সন্ধ্যা!মাঠে গড়াতো ক্রিকেট ফুটবল,শহরে উত্তাল ছাত্ররাজনীতি। এখন মরুকরন।স্মৃতিই সতত আনন্দের।হাওর, মেঘালয়,গারো পাহাড়! কি নৈসর্গিক দৃশ্য।হাওরে ভেসে বেড়াও দল বেধে গানের দল নিয়ে কি আনন্দ জীবনের!

এ শহর থেকে মতিহার ক্যাম্পাসের ৭টি বছর তন্ন তন্ন করে চষে বেড়িয়েছি।ক্লাস,ছাত্র মিছিল,আড্ডা বাবলাতলা, রাকসু ভবন, আবুর ক্যান্টিন, ইস্টিশানের গভীর রাতের আড্ডা। প্যারিস রোডের মুগ্ধতা,জোহার কবর,শহীদ মিনারের শানিত চেতনা। ঢাকায় ছাত্ররাজনীতির কালে আসা যাবার পথে মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি, সামাদ আজাদের ৮৩ লেক সার্কাস কলাবাগানের বাড়ি। রাত যতো বাড়তো তিনি ততই জাগতেন। বড় বেশী নস্টালজিক। তিন যুগের সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে নব্বই উত্তর গনতন্ত্রের জমানায় একদিকে আজকের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সারাদেশ সফর,রাজনীতি সংসদবিট কাভার, কত নেতার বাড়ি বাড়ি হানা, কত আড্ডা, হাড়ির ভিতর থেকে খবর তুলে আনা!সেই সাথে বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেশাদার সংবাদকর্মিদের সাথে আড্ডাই জীবন। জাতীয় প্রেসক্লাবে কতদিন আড্ডায় যাইনা!ডালপুরি, দুপুরের খাবার খাওয়া হয়না!
জীবনে উত্থানপতন ছিলো।আজন্ম স্রোতের বিপরীতে সাতার কেটেছি আত্নমর্যাদা হারাইনি।রুচিও না।দুঃখ যাতনা সয়েছি নীরবে।জীবনের ই যে লড়াই!আজন্মই লড়েছিযে!

আজ বড় বেশী মনে হচ্ছে কেনো প্রতি বছর লম্বা লন্ডন সফর করেছি?কেনো ছুটে গেছি নিউইয়র্ক?সেও প্রিয় শহরের প্রিয় স্বজনের টানে।হায়রে আড্ডা আর আড্ডা।প্রানবন্ত আমুদে জীবন,সেন্স অব হিউমার গড়াগড়ি খাওয়া।রাতের পর রাত জেগে একেক শহর দর্শন।

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ৮ভাইবোনের সংসার। অকালে চলে যাওয়া চার ভাইবোন।বাবা নেই,মা নেই!কত বছর দেখিনা মায়ের মুখ। কতদিন দেখা নেই বাবার। আর কোনদিন দেখা হবেনা। বাড়ি গেলে বাবার শূন্য চেয়ার, মায়ের শূন্য খাট দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখি। ভোরে তাদের কোরআন তেলাওয়াতে ঘুম ভাঙতো।নামাজ তাদের কাজা হয়নি। এখনো আল্লাহ ভীরু বাবা মার দোয়াই বড় শক্তি।সর্বশক্তিমান আল্লাহ দয়ালু, তার করুনা লাভে সুস্হ হয়ে ফিরলে আবার সুনামগন্জ যাবো। প্রেমের সুনামগন্জ। জোছনায় ভিজে যাবো, বৃষ্টি শরীর ধুয়ে দিয়ে যাবে। অগ্রজ অনুজ বন্ধুদের আড্ডায় প্রানবন্ত হবো। এ জীবনে কত পন্ডিত সৃজনশীল মানুষের দেখা স্নেহ সান্নিধ্য লাভ করেছি। শিখেছি অনেক। অগনিত মানুষ, প্রকৃতি ও বই আমাকে অনেক পাঠ দিয়েছে। আড্ডা দেবার মানুষও সমাজে কমে গেছে। তবু যা আছে কম কিসের? করোনা পারিবারিক বন্ধন শিথিল করেছে,সামাজিক বন্ধন ভেঙ্গে দিয়েছে।তবু ফের যোগাযোগ হবে। প্রানখোলা আড্ডা হবে।আবারও রবীন্দ্র সংগীত শুনে সকাল শুরু, জগজিৎ সিংয়ের গজলে রাত শেষ হবে।

আবারও তরুন বেলার মতোন ছুটে যাবো ফকির লালনের আখড়ায়,কবিগুরুর শিলাইদহ।যখন যেখানে মহব্বতের টানে ছুটে বেড়াবো।জীবনের লেনা দেনা চুকিয়ে আসছে।জীবন কত ছোট্ট এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।এক মুহুর্তের আনন্দই আমার কাছে অমূল্য সম্পদ।হাওরে ভালোবাসার বজরা ভাসাবো, যেখানে তরিতে যে ঠাই নেবে সেই যাবে।প্রিয় স্বজনেরা জানবেন আমার ভালোবাসয় কোন স্বার্থ কাজ করেনি।গভীর আবেগে হৃদয়ের অতল থেকেই ভালোবেসেছি।

( লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ