আজ বিশ্ব শ্রবণ দিবস: শোনার যত্নে অবহেলা নয়

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী ;
  • প্রকাশিত: ৩ মার্চ ২০২১, ৫:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১ মাস আগে

আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে কর্ণ। অথচ শ্রবণশক্তির যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে আমরা বরাবরই উদাসীন। বিশ্বে শতকরা ৫ ভাগের বেশি মানুষের কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণহীনতা রয়েছে। একটুখানি সচেতন হলেই এড়ানো যায় কানের অনেক রোগ। সচেতনতা আসলে রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ।শ্রবণশক্তি হ্রাস রোধ এবং বিশ্বজুড়ে কানের যত্ন কীভাবে নেওয়া যায়, সে সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছরের ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবস পালন করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-র উদ্যোগে ২০০৭ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো পালিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার কেয়ার ডে’ বা আন্তর্জাতিক কর্ণ যত্ন দিবস। প্রতিবছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি নতুন স্লোগান ঘোষণা করে। এবারের ২০২১ সালের স্লোগান বা থিম হচ্ছে ‘শোনার যত্ন সবার জন্য: রোগ নির্ণয়, পুনর্বাসন ও যোগাযোগ’
শ্রবণশক্তি হারানো মানুষকে বিচ্ছিন্ন, দুর্বল এবং একাকী করে দিতে পারে। আর তাই কানের যত্নে বিশেষভাবে আরও সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।

কানের রোগের প্রধান কারণগুলি কি কি হতে পারে?:

১) কানে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ/ইনফেকশন ।
২)হঠাৎ মধ্যকর্ণে বায়ু এবং জলের চাপের পরিবর্তনের কারণে কানের পর্দায় আঘাত । মধ্যকর্ণে ফ্লুইড জমে কানে তালা লাগা বা কান বন্ধ হয়ে যাওয়া।
৩)কানের ভিতরে ক্যালসিয়াম ক্রিস্টালের নড়াচড়ার ফলে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে মাথা ঘোরানো।
৪)একনাগাড়ে জোরালো শব্দের কারণে শ্রবণ শক্তি হারানো।
৫)বয়স বৃদ্ধির কারণে কানের পর্দা দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং বয়সজনিত কারণে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া/কানে কম শোনা।
৬) নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহারের কারণে কানের মধ্যে ঝিঁঝিঁ শব্দ হতে পারে।
৭)ওয়াক্স/ ময়লা: কানের ময়লা সাধারণত খুব হালকা হয় এবং তা অনুভব করা যায় না। কিন্তু কেউ যদি তা অনুভব করতে পারেন যেমন মনে হচ্ছে যে কান ভর্তি ময়লা এবং সেই ময়লার কারণে ব্যথা/কান বন্ধ তাহলে চিকিৎসক এর পরামর্শ নিবেন। সাধারণত কটন বাড আমাদের কানকে পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারে না।
৮)কানের বাইরের অংশের অর্থাৎ বহিঃকর্ণে সংক্রমিত চর্মরোগের প্রতি অবহেলা এবং নিজের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বেখেয়াল থেকে কানপাকার সমস্যা হতে পারে।
৯)কারো কানে কোনভাবে চড় মারলে/ সজোরে চপেটাঘাত করলে বাতাসের চাপ বেড়ে অনেক সময় পর্দা ফেটে যায়।
১০)শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগের বার বার সংক্রমণ বা ইনফেকশন হলে কান পাকা রোগ হতে পারে।

শ্রবণশক্তি হ্রাস ঠেকাতে / কানে কম শোনা রোধ করতে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ জন্য যা করতে পারি:
১) গর্ভকালীন অবস্থায় মায়ের যত্ন নেওয়া এবং সময়মতো রুবেলা, বসন্ত, হাম ইত্যাদির টিকাগুলো দেওয়া। এ সময় অটোটক্সিক বা শ্রবণে ক্ষতিকারক ওষুধ গ্রহণে বিরত থাকা। সকল টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা।
২) জন্মের প্রথম দিন বা ছয় মাসের মধ্যে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা উচিত। একে বলে ইউনিভার্সাল হিয়ারিং স্ক্রিনিং যা বিশ্বব্যাপী চলমান। এরপর শিশুটির দাঁত ওঠা, হাঁটা-চলার পাশাপাশি শব্দের প্রতি সাড়া দিচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখা উচিত। শিশুর বেড়ে উঠার অন্যতম প্রধান উপাদান হচ্ছে শুনতে পাওয়া। সাধারণত জন্মের পর ৩ মাস বয়সে আপনার শিশু ঘাড় ঘুরাতে পারবে এবং আপনার কথার উত্তরে হাসতে পারবে। ৬-১২ মাসের মধ্যে আপনার শিশু ভাঙা ভাঙাভাবে তার কথা বলতে শুরু করবে। ১৫-১৮ মাসের মধ্যে আপনার শিশু সহজ কয়েকটি কথা বলতে পারবে। এগুলো যদি না হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে পিতা-মাতা একটু চিন্তিত হয়ে পড়েতেই পারেন। এছাড়া কানে কম শুনলে আপনার শিশুও হতাশ, মনমরা হয়ে থাকবে। যদি স্বাভাবিক নিয়মে এইগুলো বাচ্চার বেড়ে উঠার মধ্যে দেখা না যায়, তখন অবশ্যই দ্রুত নাক-কান-গলা চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।
৩)গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে গান শোনা শ্রবণশক্তি কমিয়ে দেয়; তাই অবশ্যই হেডফোনে গান শোনার সময় বিরতি দিয়ে এবং ভলিউম কমিয়ে গান শোনা উচিত।
৪)কানে কম শোনার যন্ত্র/হিয়ারিং ডিভাইস সহজলভ্য করা এবং এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি। পাশাপাশি সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কানের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা / অডিওলজি টেস্টের ব্যবস্থা সহজলভ্য করার মাধ্যমে শ্রবণশক্তি রোধ সম্ভব। কারো ইতোমধ্যে শুনতে পাওয়ার কিছুটা ক্ষতি হয়েছে কিনা তা জানতে অডিওগ্রাম নামে পরিচিত হেয়ারিং টেস্ট সম্পর্কে জনমনে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ যারা শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন তারা প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারেন।
৫) যদি হঠাৎ করেই কেউ কানে কম শোনার সমস্যায় আক্রান্ত হন তাহলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। আকস্মিক কানে শোনার শক্তি হারানো রোগী যতো দ্রæত তার চিকিৎসকের কাছে যাবেন ততো দ্রুত আরোগ্য লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের কানের যে কার্যক্রম, সেটা প্রাথমিকভাবে হলো কানে শোনা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। এ দুটো কানের বিশেষ কাজ। প্রতিনিয়তই এ দুটি আমাদের জন্য জরুরি। কানে কম শোনা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একটি প্রচলিত সমস্যা। আর তাই কানে কম শোনার সঠিক কারণ নির্ণয় এবং এই সমস্যা প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

লেখক : ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী; এমবিবিএস; বিসিএস (স্বাস্থ্য); নাক-কান-গলা বিভাগ; বিএসএমএমইউ (প্রেষণে), ঢাকা। এক্স সহকারী রেজিস্ট্রার, সিওমেক হাসপাতাল।

 

প্রিয় পাঠক, আপনিও সিলেটডায়রি’র অংশ হয়ে উঠুন। স্বাস্থ্য, শিল্প ,সাহিত্য, ক্যারিয়ার, পরামর্শ সহ যেকোন বিষয় নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ