সীমান্ত হত্যা রোধে স্পর্শকাতর এলাকায় বিজিবি-বিএসএফ যৌথ টহল

নাজমুল ইসলাম, জৈন্তাপুর ;
  • প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ৯:৫৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৪ মাস আগে

ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫১তম সীমান্ত সম্মেলনে যৌথ বিবৃতিতে সীমান্তে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে উভয় বাহিনী যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছেন।

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো: সাফিনুল ইসলাম, এনডিসি, পিএসসি‘র নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ ১১সদস্যের প্রতিনিধিদল ভারতের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫১তম সীমান্ত সম্মেলন অংশ গ্রহন করতে (২২-২৬) ডিসেম্বর তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।

সম্মেলনে বিএসএফ মহাপরিচালক শ্রী রাকেশ আস্থানা আইপিএস’র নেতৃত্বে ভারতের স্বরাষ্ট্রও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশগ্রহন করেন।

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো: সাফিনুল ইসলাম এনডিসি, পিএসসি‘র নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে অংশ গ্রহন করেন বিজিবি’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ.এম.এম খায়রুল কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক এ.কে.এম ফজলুর রহমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন সুরক্ষা বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান, বিজিবি’র স্টাফ অফিসার পরিচালক সৈয়দ আশিকুর রহমান, বিজিবি’র কমান্ডিং অফিসার ব্যাটালিয়ান মো: আমিনুল হক, বিজিবি’র স্টাফ অফিসার পরিচালক মো: আরেফুর রহমান, বিজিবি’র ডিজি’র পিএস পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আরসুদা খান, বিজিবি’র স্টাফ অফিসার অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মইন, বিজিবি’র ডেপুটি পরিচালক এডিসি ডিজি মো: আবু নাঈম।

বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা জানানোর মাধ্যমে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ মহাপরিচালককে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

তিনি সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফ এর সমন্বিত যৌথ কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সিবিএমপি কার্যকর ভাবে বজায় রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ২৫ ডিসেম্বর শুক্রবার গুয়াহাটিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে আলোচনার যৌথ দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ৫১তম সীমান্ত সম্মেলনের সমাপ্তি হয়।

সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহের: বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ ভারতীয় নাগরিক, দুর্বৃত্ত কর্তৃক বাংলাদেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা, আহত, মারধরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সর্বদা দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার সম্পকের প্রশংসা তারা প্রত্যাশা করে যে, বিজিবি এবং বিএসএফ সীমান্ত হত্যার ঘটনা শূণ্যে নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখতে এবং অপরাধীদেরকে হত্যার পরিবর্তে নিজ নিজ দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানান।

সীমান্তে হত্যার ঘটনা অদূর ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে বিএসএফ মহাপরিচালক আশ্বাস প্রদান করেন।

সীমান্তে মানবাধিকার সুরক্ষা ও সহিংসতা রোধে যৌথ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অধিক কার্যকরী উদ্যোগ হিসেবে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাসমূহে রাত্রিকালীন যৌথ টহল পরিচালনার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছেন। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকায় জনসচেতনতামূলক কর্মসূচী আরও বেগবান করা, যথার্থ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণসহ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উভয় পক্ষ সম্মত হন।

আসামের গুয়াহাটিত অনুষ্ঠিত ৫১তম বিজিবি-বিএসএফ’র মহাপরিচালক পর্যায়ে ৫দিন ব্যাপী সীমান্ত সম্মলেনের উভয় বাহিনীর যৌথ বিবৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে বিজিবি‘র জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

যৌথ বিবৃতিতে বিজিবি মহাপরিচালক সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সিবিএমপি’এর ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন ধরণের আন্ত:সীমান্ত অপরাধ যেমন মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বিশেষ করে ইয়াবা পাচার, আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালান, গবাদি পশু, জালমূদ্রা, স্বর্ণ প্রভৃতি চোরাচালানের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এসকল অপরাধ দমনের জন্য বিএসএফ’র সহযোগিতা কামনা করেন। বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, অবৈধ মাদক পাচারের ফলে উভয় দেশের যুব সমাজের মধ্যে মাদকাসক্তি মারাত্বক ভাবে বেড়েছে যা উভয়ের জন্যই বিপদজনক এবং এটাকে কার্যকর ভাবে মোকাবেলা করা দরকার। এব্যাপারে উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে চোরাকারবারীদের সম্পর্কিত এমন তাৎক্ষণিক ও দরকারী তথ্য পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান এবং প্রয়োজনে যৌথ অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে ভারতীয় নাগরিক এবং বিএসএফ সদস্যরা প্রায়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যা দু’টি বন্ধুত্বপূর্ণ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে-এ বিষয়ে বিজিবি মহাপরিচালক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে বিএসএফ’র সহযোগিতা কামনা করেন। উভয় পক্ষই অবৈধ ভাবে সীমানা অতিক্রম, সীমানা লঙ্ঘন থেকে সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে বিরত রাখতে সম্মত হয়েছে একই সাথে উভয় বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সীমান্তের নিয়মনীতি বজায় রাখার ব্যাপারে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনে ভার্চুয়ালি ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী জেলার পদ্মা নদীর ১.৩ কি.মি. নিরীহ পথের অনুরোধ বিবেচনা করার আশ্বাসদেন। বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ মহাপরিচালককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়টি অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ করেন। বিএসএফ মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস প্রদান করেন।

বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের মিজোরাম রাজ্যের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আস্তানার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং আস্তানাগুলো ধ্বংস করার জন্য অনুরোধ করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’র কথা উল্লেখ করে বিএসএফ মহাপরিচালক ঐসব আস্তানা যদি থাকে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।

উভয় পক্ষ বিদ্যমান পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট ও আস্থা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষই পূর্বে অবগত করা ছাড়া সীমান্তের ১৫০গজের মধ্যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ না করার বিষয়ে পারস্পরিক সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। উভয় পক্ষই বন্ধ থাকা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ গুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধানের ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।

বিজিবি ও বিএসএফ উভয় মহাপরিচালক সম্মেলনের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। উভয়েই সীমান্তে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে যৌথ ভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। উভয় পক্ষ মহাপরিচালক পর্যায়ের পরবর্তী সীমান্ত সম্মেলন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আজ ২৬ ডিসেম্বর শনিবার বিকালে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করার কথা রয়েছে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ