আমাদের পৃথিবী ও প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সমাচার

শ্রী নিবাস দে;
  • প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

আমরা যারা স্কুল কলেজে পড়াশুনা করেছি তাদের ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া সম্বন্ধে একটি প্রাথমিক ধারণা থাকার কথা। এই সূক্ষ্ম আর অতি সূক্ষ্ম জীবাণুগুলো আকাশে বাতাসে, জলে স্থলে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের এ পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রকারের ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান রয়েছে। জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমাদের জীবনে ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব বিষয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইরোলজি আর ব্যাক্টেরওলজি বিভাগ আছে যেখানে এই ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার উপর পাঠ দান আর গবেষণা ও করা হয়।

জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় আজ আইটি অর্থাৎ ইনফরমেশন টেকনোলজি’র বিকাশ উন্নতি’র চরম শিখরে। বর্তমানে ব্যবসা বাণিজ্য, অর্থনীতি’র কর্মকাণ্ড, স্কুল কলেজের পাঠদান, ব্যাংক,বীমা, অফিস আদালত,হাসপাতালে- হিসাবপত্র ও ডাটা-জীবনবৃত্তান্ত সংরক্ষনে কম্পিউটার বা ল্যাপটপের দ্বারা করা হচ্ছে। এই আইটি সেক্টরের দিগন্ত দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানব সভ্যতা আজ উচ্চতর স্তরে বিকাশমান। তা স্বত্বে নানা প্রতিবন্ধকতাও আসে!

বিজ্ঞানের চর্চা ও বিকাশ, আমাদের নিকট যেমন আশীর্বাদ হয়ে আছে তেমনি বিজ্ঞান গবেষণার অপপ্রয়োগ অনেক সময় অভিশাপ রূপে দেখা দেয়। এরূপ অপ-গবেষণা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, তবেই বিজ্ঞানের ফলপ্রসূ প্রয়োগ আমাদের নিকট আশীর্বাদ হয়ে বিকাশমান হবে।

এখন করোনাভাইরাসের কথায় আসি। করোনাভাইরাস একপ্রকার প্রাণঘাতী রাক্ষুসে সূক্ষ্ম জীবাণু যার সংক্রমণে বিশ্বমানব আজ এক বিরাট সংকটে নিপতিত। এই করোনাভাইরাসে দুর্বল মানুষ, যাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারাই এর আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তাছাড়া ও যাদের লংটার্ম অসুখ- যেমন ডায়াবেটিস কিংবা ফুসফুসের অসুখ আছে কিংবা শ্বাস কষ্টজনিত রোগে ভোগেন তারাও এর আক্রমণের শিকার হয়ে থাকেন, ষাটোর্ধ লোকেরা এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার বেশি ঝুঁকি থাকে। বিশ্বে আজ অনেক দেশে লেগে আছে দ্বন্দ্ব আর সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শক্তিধর দেশগুলো’র মাঝে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। আজ পারমাণবিক অস্ত্র আর রাসায়নিক বিষাক্ত জীবাণু অস্ত্র যেন বিজ্ঞানের অভিশাপ হয়ে মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার মাঝে চীনের উহান থেকে উঠে এলো এই করোনাভাইরাস!

পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য যখন বিনষ্ট হয় তখনই নানা বিপর্যয় নেমে আসে। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, মহামারী, সুনামি, ভূমিকম্প এসবই প্রকৃতির বিরূপ ক্রিয়ার ফল, আজ পৃথিবীর আবহাওয়া, জলবায়ু দূষিত, উন্নত বিশ্বের শিল্পকারখানা থেকে মাত্রাতিরিক্ত ‘কার্বন’ নিঃসৃত হচ্ছে এবং এ নিঃসৃত কার্বন বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরে গিয়ে তা ভেঙে দেয়, সৃষ্টি হয় বড় বড় ছিদ্রপথের, আর এই ছিদ্রপথে সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রে (ultraviolet ray) এবং কসমিক রে (Cosmic ray) পৃথিবীতে এসে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে, এতে পাহাড় পর্বত আর মেরু প্রদেশের বরফ গলে জলের ধারা সমুদ্র পানে যাচ্ছে, সমুদ্রে জল বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে অনেক দেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলের নিচে তলিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। ওজন স্তরের সঙ্গে নিঃসৃত কার্বন কণার বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড নামের বিষাক্ত গ্যাস, যা বায়ুমণ্ডলে সঞ্চালিত হচ্ছে, আর পৃথিবীর আবহাওয়া দূষিত করছে।

অনেক দেশে বৃক্ষরাজি, গাছপালা, বনাঞ্চল ধ্বংস করার ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে ফলে নিত্যনুতন রোগবালাই সৃষ্টি হয়, মানুষ, পশুপাখি প্রাণ হারায়। বিশ্ব প্রকৃতির প্রতি উপাদানে ঈশ্বর বিদ্যমান, সাগর মহাসাগরের বিশালতায়, সুউচ্চ পাহাড় পর্বত আর অতি বড় অশ্বত্থ বা অন্য কোনো প্রাচীন বৃক্ষ, শক্তিমান পশু, কিংবা ময়ূর পাখি, প্রকৃতির এসব সৃষ্টির মাঝে আমরা স্রষ্টার বিভূতি দেখতে পাই। কাজেই প্রকৃতির অনিষ্ট করার অর্থ হলো স্রষ্টার সৃষ্টি’র বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে, আর মানুষের জানমাল, সম্পদ সবই ধ্বংস হয়ে যায়।

এ ব্যাপারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ একই টেবিলে বসে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, শুধু নিতে হবে না, তার প্রতিফলন ও করতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই! আমাদের পৃথিবীর আলো বাতাসকে বাঁচাতে হলে বিশ্ব প্রকৃতি যাতে বিনষ্ট না হয় তার প্রতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আজ করোনাভাইরাস বিশ্বে মহামারী রূপে দেখা দিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, প্রতি একশত বৎসর পর পৃথিবীতে মহামারী দেখা দেয়, আর এর ফলে লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। করোনা মহামারীতে এ পর্যন্ত পনেরো লক্ষেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছেন, আর দিন দিন এর ফলে মৃত্যু আর আক্রান্তে’র সংখ্যা বাড়ছে। আজ এই ভাইরাস সংক্রমণ দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে যারা বিভিন্ন দেশে গেছেন তাদের থেকে এই ভাইরাস প্রাথমিক পর্যায়ে ছড়িয়েছে বলা হচ্ছে। এই ভাইরাস এ আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করা, এমনকি রোগী যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানে ও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে, কাজেই নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে আর মাস্ক পরে লোকের সংস্পর্শে যাওয়া উচিত।প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া ঠিক নয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণে যে সব উপসর্গ দেখা দেয় তা হলো- সর্দি, জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা আর স্বাদ কিংবা গন্ধ না পাওয়া, অনেক সময় পাতলা পায়খানা আর বমি ও হয়। শিশু কিশোর, যুবক, প্রবীণ, পুরুষ মহিলা, সকলেই এর সংক্রমণের শিকার হতে পারেন। বিশেষকরে প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম থাকায় তারা বেশি হরে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকেন।

এই করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর প্রকোপ থেকে বাঁচার উপায় হলো শুধুমাত্র সচেতন থাকা! বাড়ির বাইরে গেলে মাস্ক পরা, অন্যের সঙ্গে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলে, কারো সঙ্গে হাত মেলানো বা গলা লাগানো কিংবা কোলাকুলি না করা, কারো শরীরে স্পর্শ না করা। সর্বোপরি নিজ পরিবারের বা বাড়ির বাইরের কারো কাছে গেলে, কিংবা বাইরে গেলে, বাড়ি এসে জামাজুতো আলাদা রাখা।

এগুলো না মেনে চললে, অন্যের শরীর হতে প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ আপনার শরীরে আক্রমণ করতে পারে। এসব কোনো অবস্থাতেই অবহেলা করা করা ঠিক না, সরকারিভাবে যে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বলা হয় তা কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে।

শীতকালে সকলেরই একটু কাশি সর্দি হয়ে থাকে। এবছর একটু ভিন্ন, যদি কারো সর্দি কাশি হয়ে থাকে, তাকে কোনোভাবেই অবহেলা না করে দ্রুত করোনা টেস্ট করানো উচিত, আর ততদিন নিজেকে একটু আলাদা রাখা দরকার।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা তার স্বরূপের ন্যায় মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির সব প্রাণিদের মধ্যে আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুন এ চারটি গুণ বিদ্যমান, শুধু মানুষের মাঝে একটি বিশেষ গুণ বেশি আছে আর সেটি হলো তার জ্ঞান-প্রজ্ঞা-বিবেক। মানুষ তার জ্ঞান ও বিবেক দ্বারা ভালোমন্দ বিচার করতে পারে। আমাদের দেশে হাটে বাজারে, রাস্তা ঘাটে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না,অনেকে মাস্ক ব্যবহার না করে বাইরে যাচ্ছে- এটা ঠিক নয়! স্বাস্থ্য সচেতন না হলে কখন যে করোনা রাক্ষসী’র সংক্রমণে শয্যাশায়ী হতে হবে তা বলতে পারবেন না! আপনার নিকট হতে অন্যের দেহে সংক্রমিত হয়ে করোনাভাইরাস মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিবে!

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত এনেছে, উন্নত বিশ্বের হয়েও, অনেক দেশে আবার লক-ডাউন দেয়া হয়েছে, আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে ও শীতকালে ঠাণ্ডাজনিত কারণে করোনাভাইরাস এর সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা আছে, এজন্য কঠোরতা অবলম্বন করে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন।

জীবন আর জীবিকা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, জীবন বাঁচানো’র জন্য অর্থ উপার্জন প্রয়োজন, কাজেই পেশাগত কাজ, ব্যবসা বাণিজ্য, সবই করতে হবে, কিন্তু সচেতন থেকে আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে।

করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাতে আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা এসেছে, অনেক দেশে শিল্প উৎপাদন আর নানান কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ কাজ হারিয়ে জীবিকা অর্জন করতে পারছে না। সমস্ত পৃথিবীতে আজ এক ভয়াবহ অবস্থা বিরাজমান, এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো বিশ্বের সকল দেশের নেতৃবৃন্দকে সম্মিলিতভাবে প্রয়াস চালিয়ে প্রয়োজন, করোনা মহামারীর মোকাবেলা করা।

আজ এর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকরী হতে, সবার কাছে এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে, আরও কত লোকের প্রাণ এই করোনাতে হারাবে, তা কে জানে!

কাজেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর হাত শক্ত করে তাদের দেয়া স্বাস্থ্যবিধির আওতায় জনগণকে আনতে হবে। চাই সর্বোপরি জনসচেতনতা, দরকার ছাড়া বাইরে না যাওয়া, আর বাইরে গেলেও মাস্ক পরে বাইরে যাওয়া, লোকের সাথে দূরত্ব বজায় রাখা।

সর্বোপরি সচেতনতার সাথে, সকল স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলে, আমরা এই করোনাভাইরাসকে অতি সহজেই মোকাবেলা করবো- এ প্রত্যাশা রইলো।

শ্রী নিবাস দে

সাবেক অধ্যক্ষ, এমসি কলেজ, সিলেট

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ