সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ: কমিটি আসার আগেই প্রশ্নবিদ্ধ?

নিজস্ব প্রতিবেদক;
  • প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর ২০২০, ৭:৩১ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৫ মাস আগে

খসড়া কমিটি কেন্দ্রে জমা দেয়ার পর দেড় মাস অতিবাহিত হলেও এখনো অনুমোদন পায়নি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ঠিক কবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন পাবে সেটিও জানা নেই কারো। তাই এখনো দুই নেতায় সীমাবদ্ধ সিলেট মহানগর ইউনিট।

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর নগরীর আলিয়া মাদরাসা মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অধ্যাপক জাকির হোসেনের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর দেশে করোনা সংক্রমণে থমকে যায় কমিটি গঠনের কার্যক্রম। পরবর্তীতে কেন্দ্রের নির্দেশে একসপ্তাহের মধ্যে তালিকা প্রস্তুত করে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির খসড়া তালিকা কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

সেই সাথে কয়েকজনকে রাখা হয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে। কেন্দ্রে এই কমিটি জমা হওয়ার পরেই সিলেটে শুরু হয় অসন্তোষ। জমা হওয়া কমিটিতে দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দেয়া, অবমূল্যায়ন এবং সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেন কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী। এই ক্ষোভ থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে একটি বিকল্প কমিটিও জমা দেন তারা। এরই মাঝে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র পদপ্রত্যাশী কিছু নেতার নাম আলোচনায় এলে আবার ঝুলে যায় কমিটি।

নানা অভিযোগ আমলে নিয়ে গত মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনকে ঢাকায় ডেকে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে বসে সমালোচিত বেশ কয়েকজনের নাম কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয় এবং নতুন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু সংশোধিত এই কমিটিতে থাকা অনেকের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ।

সূত্র বলছে, প্রথম জমা দেয়া খসড়া তালিকায় বয়সের কারণে সক্রিয় নন এমন কয়েকজন নেতাকর্মী ছাড়াও নানা অভিযোগের কারণে কিছু সক্রিয় নেতাদেরও বাদ দেয়া হয়। কেউ কেউ বাদ পড়েন কোনো কারণ ছাড়াই। মহানগরের গত কমিটি থেকে বাদ পড়েন সিরাজুল ইসলাম, সিরাজ বক্স, মফুর আলী, তুহিন কুমার দাস, তপন মিত্র, জগদীশ দাস, অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম, ফাহিম আনোয়ার চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন রানা, রাধিকা রঞ্জন হোম চৌধুরী, শাহানারা বেগম, প্রিন্স সদরুজ্জামান, মিছবাউল ইসলাম সুইট, আবরার আহমদসহ আরো কয়েকজন সদস্য। এদের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম, সিরাজ বক্স, তুহিন কুমার দাস, ফাহিম আনোয়ার চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন রানা, মিফতাউল ইসলাম সুইট বিগত দিনে দলীয় কার্যক্রমে একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। আর রাধিকা রঞ্জন হোম চৌধুরী, আবরার আহমদ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে। রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও খসড়া কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন তপন মিত্র, জগদীশ দাস, অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলামসহ কয়েকজন সদস্য। তবে বাদ পড়াদের কয়েকজনকে উপদেষ্টা কমিটিতে রাখা হয় বলে জানা গেছে।

এছাড়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের করা কমিটিতে জায়গা হয় বিতর্কিত এবং সিলেটের রাজনীতিতে অপরিচিত বেশ কয়েকজনের। এদের মধ্যে উপ-দপ্তর সম্পাদক করা হয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেনের ‘হাউজ টিউটর’ অমিতাভ চক্রবর্তীকে। তিনি একসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিজান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মিজান চৌধুরীর সাথে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তার ছবিও ফেসবুকে ভাইরালও হয়। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী শফিউল আলম জুয়েলকে। তিনিও অতীতে কখনো মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তবে জানা গেছে, মাহবুব উল আলম হানিফের সাথে বৈঠকে সংশোধিত কমিটিতে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে আরেক জুয়েলকে।

তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক জাকির হোসেনের খালাতো ভাই ইলিয়াস আহমদ জুয়েল। কখনোই মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দেখা না গেলেও শুধুমাত্র সভাপতির ঘনিষ্টজন হওয়ায় কমিটিতে আছেন গোলাপগঞ্জের প্রকৌশলী আতিকুর রহমান সুহেদ। এছাড়া নতুন মুখ হিসেবে কমিটিতে আছেন সিলেট চেম্বারের সহ সভাপতি তাহমিন আহমদ, ব্যবসায়ী জুমাদিন আহমদসহ কয়েকজন।

দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর পদে থাকা কাউকে কমিটিতে না রাখার সিদ্ধান্ত হলেও কমিটিতে স্থান হয়েছে অধ্যাপক জাকিরের ঘনিষ্ঠজন, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলামের ছেলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ চৌধুরী জয়ের।
এদিকে জমা দেয়া এই কমিটি নিয়ে ক্ষুব্ধ সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও।

কমিটি গঠনের শুরুতে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন নেতাকর্মীদের কাছে বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কমিটির জন্য একটি তালিকা দিয়েছেন। এই তালিকা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী সেলিনা মোমেন, ব্যক্তিগত সহকারী শফিউল আলম জুয়েলসহ কয়েকজনকে রাখা হয়েছে। সেই সাথে নিজের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রেফারেন্স দেখিয়ে কমিটিতে ঢুকান তিনি। সব কিছু জানতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি এসব বিষয় দলের হাইকমান্ডকেও অবগত করেছেন বলে জানা গেছে।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জগদীশ দাস বলেন, আমরা আশাবাদী ডিসেম্বর মাসেই আসতে পারে মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। তবে কবে আসবে সেটি হাইকমান্ডই ভালো বলতে পারবে, তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা চাই কমিটিতে ত্যাগী ও দুর্দিনের কর্মীদেরকে মূল্যায়ন করা হয়। কোনোভাবেই যেন কোনো অন্য রাজনৈতিক ঘরানার মানুষকে দলে অন্তর্ভুক্ত না করা হয়। আমরা চাই নির্যাতিত ও নিপীড়িত নেতাকর্মী, বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সৈনিক কারা, সেটি বঙ্গবন্ধুকন্যা ভালোই জানেন। তিনি সিলেটের সবাইকে চেনেন। তৃণমূলের রাজনীতির খবর তিনি রাখেন। আমরা আশাবাদি সিলেট-মহানগর আওয়ামী লীগ নবীন-প্রবীণের সমন্বয়েই হারানো ছন্দ ফিরে পারে।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা হাইকমান্ডের নির্দেশনা মেনেই স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নেতাদের তালিকা ঢাকায় পাঠিয়েছি। এই বিষয়ে এখন কেন্দ্রই সকল সিদ্ধান্ত নিবে। উপ-দপ্তর সম্পাদক পদে অমিতাভ চক্রবর্তীকে আমার বাসার লজিং মাস্টার উল্লেখ করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য। অমিতাভের সাথে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে যে দাবি করা হয়েছে সেটিও ঠিক নয়।

অমিতাভ আপাদমস্তক একজন আওয়ামী লীগ প্রেমিক। তিনি মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বই লিখেছেন ‘শতবর্ষে শতবাণী’ নামে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তারই একটি ইংরেজি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায়। তিনি উচ্চশিক্ষিত। উপ-দপ্তর সম্পাদক পদে এরকম মানুষই আমাদের কাছে যোগ্য মনে হয়েছে। এখন কেন্দ্র বিবেচনা করবে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য।’

আর ইলিয়াস আহমদ জুয়েলকে বিষয়ে অধ্যাপক জাকির বলেন- ‘দেখেন আমার আপন ভাই দুলাল, আমার আরেক ভাই হুরায়রা ইফতার হোসেনও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি তো তাদের নাম কমিটিতে দেইনি। আমরা চেয়েছি নেত্রীর নির্দেশে একটি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন কমিটি উপহার দিতে। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিলো না। এখন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন।’

এদিকে এ বিষয়ে রোববার রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেনের মন্তব্য জানার জন্য ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। মন্ত্রী জরুরি মিটিংয়ে থাকায় কথা বলতে পারেননি। তবে তার ব্যক্তিগত সহকারী জানিয়েছেন, পলিটিক্যাল কোনো বিষয়ে স্যার মন্তব্য করবেন না। তার মন্তব্য এসব রাজনৈতিক বিষয় দেখবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাই।

সূত্র : দৈনিক একাত্তরের কথা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ