টিলাগড়ের দাদা-ভাই

বিশেষ প্রতিনিধি;
  • প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর ২০২০, ১০:৩৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৬ মাস আগে

একজন দাদা, আরেকজন ভাই। কর্মীরা দাদা আর ভাই বলতে অজ্ঞান। দাদার কর্মীরা ভাইয়ের কর্মীদের শত্রু। ভাইয়ের কর্মীরা আবার দাদার কর্মীদের সহ্য করতে পারেন না। পান থেকে চুন খসলেই দাদার অনুসারীরা হামলে পড়েন ভাইয়ের অনুসারীদের উপর, সুযোগ পেলে ভ্ইায়ের অনুসারীরা টুঁটি চেপে ধরেন দাদার অনুসারীদের। এমনই চলছে। পাটা-পুতার লড়াইয়ে দাদা-ভাইয়ের রেষারেষিতে মরিচের মতো অবস্থা টিলাগড়সহ সিলেটের সাধারণ মানুষের। দাদা-ভাইয়ের ‘ছোটভাইয়েরা’ সিলেটকে আতঙ্কের মধ্যে রাখলেও রসুনের কোয়ার মতো প্রান্ত্ এসে ঠিকই এক আছেন দাদা আর ভাই। এখানে যে ভাগ-বাটোয়ারার বিষয় রয়েছে-তাই এক তো হতেই হবে। প্রকাশ্যে দুজনের মাঝে বিভাজনের যে পর্দা লোকচক্ষুর আড়াল হলে সেটি উঠে যায়। তখন তারা ‘হরিহর আত্মা’।

এক সময় তারা ‘হরিহর আত্মা’ই ছিলেন। রাজনীতিতে যখন তাদের পথচলা শুরু হয় তখন আজাদুর রহমান আজাদ ও রঞ্জিত সরকার ছিলেন প্রাণের সখা। ধীরে ধীরে যখন তারা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকেন তখন তাদের অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুজনে মিলেই তখন অনুসারীদের সামাল দিচ্ছিলেন। আজাদকে ‘বড়ভাই’ আর রঞ্জিতকে ‘দাদা’ মেনে অনুসারীরা মাঠ দাপাতে শুরু করেন। ক্রমে অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন দেখা যায় কেউ দাদার কাছ থেকে একটু বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছেন আবার কেউ ভাইয়ের স্নেহের ভাগ পাচ্ছেন বেশি। দাদার ¯েœহবঞ্চিতরা ভাইয়ের কাছে ভেড়ার চেষ্টা করেন আবার ভাইয়ের সুনজরে না থাকায় কেউ দাদার আনুগত্যটা আরও বেশি করে মেনে নেন। এ ভেদাভেদের জেরে একসময় দুই বন্ধুর মাঝেও একটি দেয়াল গড়ে উঠে। দেয়ালের এপারে-ওপারে আলাদা আলাদা বলয় গড়ে তুলেন তারা।

তারপর শুরু হয় নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেওয়ার পালা। কে কার চেয়ে বড় তার প্রমাণ দিতে বীরদর্পে মাঠে নামেন দাদা-ভাইয়ের অনুসারীরা। দাদা আর ভাইয়ের হয়ে তারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি আর টেন্ডারবাজির মাধ্যমে কাঁচা টাকার তহবিল গড়ে তুলেন। তার থেকে নিজেদের পকেটও ভরে, খুশি হন দাদা-ভাইও। দাদা-ভাইয়ের কোনো চাওয়া-পাওয়া ই অপুর্ণ রাখেন না তার। দাদার পাঁঠা খাওয়ার ইচ্ছে হলে তারা হানা দেন ছাগল উন্নয়ন খামারে। যখন যা প্রয়োজন তারা যোগাড় করে দেন। পকেটে কড়কড়ে টাকা, হাতে অস্ত্র ‘ছোটভাই’দের আর পায় কে? তারা ছুটেন নেশার পথে, অপরাধের অন্ধকার থেকে অন্ধকার দুর্গে। অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ত্রাস তৈরি করেন জনমনে। রাজপথে-ক্যাম্পাসে তাদেে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়। আধিপত্যের লড়াইয়ে লাশ পড়ে একটার পর একটা। একপক্ষ দায়ী করে আরেক পক্ষকে। দায় ঠেলাঠেলি চলে নেতাদের মাঝে। অপরদিকে কান্নার রোল উঠে যে মারা গেছে তার ঘরে। মা মূর্ছা যান, বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন, নেতারা খবরও নেন না। উল্টো ধামাচাপার চেষ্টা চলে।

অনুসারীদের উপর ভর করে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন দাদা আর ভাই। তাদের চোখে এখন নতুন নতুন স্বপ্ন। একজনের চোখ যদি সংসদের দিকে তো অন্যজনের চোখ নগরভবনের শীর্ষ চেয়ারটির দিকে। সিলেট থেকেই সুনামগঞ্জের হয়ে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন রঞ্জিত সরকারের চোখে। আজাদুর রহমান আজাদ ইতোমধ্যেই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিল হয়েছেন, তার স্বপ্ন মেয়র হওয়ার। ‘হাঁটি-হাঁটি, পা-পা’ করে তারা এগিয়েও যাচ্ছেন লক্ষ্যের দিকে। ক্ষমতা মুঠোয় পুরতে হলে সবার আগে চাই দলের পদ। পেছনে অনুসারীদের বিশাল বহর থাকায় দল তাদের অবজ্ঞা করতে পারেনি। সম্মানজনক পদ পেয়েছিলেন, আরও উপরের পদে উঠার পথও তৈরি করেছিলেন।

তবে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনা হয়তো তাদের সব স্বপ্নে জল ঢেলে দিতে পারে। হয়তো কপাল পুড়তে পারে এ ঘটনায়। সিলেট জেলা ও মহানগরের প্রস্তাবিত কমিটিতে তারা দুজনেই নাকি সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বিবেচনায় ছিলেন। সংগঠনকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়ায় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ হয়তো তাদের কপালে আর জুটছে না। কেন্দ্র থেকে যে বার্তা মিলছে-কমিটি থেকে তাদের একেবারেই মাইনাস হয়ে যাওয়াটাও মোটেই বিচিত্র নয়।

সূত্র : দৈনিক একাত্তরের কথা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ