অপরাধের দুর্গে দুই সেনাপতি

বিশেষ প্রতিনিধি;
  • প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২০, ৮:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৬ মাস আগে

টিলাগড়। এখানেই ছিলো সিলেটের শেষ হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের একটি সুরক্ষিত দুর্গ। সিলেটবিজয়ী সাধকপুরুষ হযরত শাহজালালের (রাহ.) কাছে পরাজিত হয়ে সব ছেড়ে পালিয়ে যান গৌর গোবিন্দ। তার সে দুর্গটি কালের গর্ভে কবেই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া সে দুর্গের ধ্বংসাবশেষের স্পর্শ স্মৃতি হয়ে এখনও লেগে আছে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের টিলার গায়ে। সাতশ বছর পর অপকর্মের ঘাঁটি হিসেবে সেখানেই যেনো এক নতুন দুর্গ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দুষ্কর্মের সেই দুর্গের দখল নিতে প্রতিনিয়ত লড়ে চলেছেন দুই সেনাপতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী দলটি যাদের কাঁধে সিলেট জেলা ও মহানগরের শিক্ষা-ক্রীড়া-সংস্কৃতি বিকাশের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলো- টিলাগড়কে কেন্দ্র করে তারাই মেতেছেন রক্তের হোলিখেলায়। সিলেটের শিক্ষাপল্লী হিসেবে পরিচিত টিলাগড়কে কেন্দ্র করে পরবর্তী প্রজন্মের মেধা-মননের বিকাশে ভ‚মিকা রাখার সুযোগ তাদের সামনে থাকলেও তারা সে পথ ধরে হাঁটেননি।

তারা পাঠশালা খুলেছেন অস্ত্রশিক্ষার, তারা খেলাচ্ছেন অস্ত্র দিয়ে, তরুণ-যুবাদের ঠেলে দিচ্ছেন ত্রাসের পথে। এ দুই সেনাপতির সৈন্যবাহিনীর ভয়ে টিলাগড়সহ পুরো সিলেটই তটস্থ। পুরো সিলেটের বুকে কাঁপন ধরিয়ে তারা নিজেদের পকেট ভরছে। ত্রাসের আয়ের সে ভাগ তারা সেনাপতিদেরও পৌঁছে দিচ্ছে যার বিনিময়ে মাথার উপর নির্ভরতার ছায়া পাচ্ছে তারা।

সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনও ঘোষণা হয়নি। নেতারা এখনও তাই পুরনো পরিচয়েই পরিচিত। পুরনো কমিটিতে জেলার যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন রঞ্জিত সরকার আর মহানগরে শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আজাদুর রহমান আজাদ। দুজনেই টিলাগড়ের বাসিন্দা। আর এটিই তাদের জন্য সুযোগ হয়ে ধরা দিয়েছে। সিলেটের শিক্ষাপল্লী হিসেবে পরিচিত টিলাগড় ও আশপাশের এলাকা।

এখানে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি সরকারি কলেজ, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। তাই সিলেটের ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে প্রতিষ্ঠা পায় টিলাগড়। এখান থেকে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে উত্থান ঘটে রঞ্জিত সরকার ও আজাদুর রহমানের। তারপর যুবলীগ হয়ে দুজন প্রতিষ্ঠা পান আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে। তবে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে যে ‘মজা’ তারা পেয়েছিলেন তা ছাড়তে পারেননি।

নিজেরা ছাত্রলীগ ছেড়ে এলেও ছাত্রলীগকে মুঠো থেকে ছাড়েননি কখনও। নিয়ন্তা হিসেবে থেকে গেছেন সব সময়ই। আজাদ-রঞ্জিত শুরুর দিকে এক হয়েই সামাল দিয়েছিলেন টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের রাজনীতি। পরে আধিপত্য আর প্রভাব বিস্তারের মোহে দুজনের দুটি পথ দুদিকে বেঁকে গেছে। আলাদা আলাদাভাবে তারা ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। নিজেদের দাবার গুটি হিসেবে তারা ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের ব্যবহার করতে থাকেন।

‘পাপে’র রাজ্যের সেনা হিসেবে এরা দখলবাজি-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রে ভরসা হয়ে উঠেন সেনাপতিদের। প্রতিদান হিসেবে তাদের অনুসারীরা পেয়ে যান সব অপকর্মের লাইসেন্স। মাথার উপর ছায়া পেয়ে অনুসারীরা গড়ে তুলেন ছোট ছোট গ্রুপ-উপগ্রুপ।
সিলেটের ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই টিলাগড়কেন্দ্রিক। এর বাইরে রয়েছে সরকারি দুগ্ধ খামার, ছাগল উন্নয়ন খামার। সারা বছরজুড়েই এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নমূলক বা নির্মাণ কাজ লেগে থাকে।

নিজেদের বাহিনীর মাধ্যমে আজাদ-রঞ্জিত টেন্ডার পাইয়ে দেন নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা ঢুকে দুজনের পকেটে। নিজেদের আলাদা বলয় থাকলেও এক্ষেত্রে দুই সেনাপতির মাঝে কখনোই বিরোধ দেখা দেয় না। কারণ এসব ক্ষেত্রে একজন যদি আরেকজনকে বাগড়া দেন তখন মাথা ঢুকিয়ে ফেলতে পারে অন্য কেউ; কিংবা জানাজানি হলে পুরো প্রক্রিয়াটাই ভেস্তে যেতে পারে। তাহলে ‘আম-ছালা’ দুটোই হারানোর ভয় আছে। তাই তারা এখানে এক।

নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কলেজের ঐতিহ্য জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে হাত কাঁপেনি তাদের। ২০১২ সালে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে যখন অগনিকান্ডের ঘটনা ঘটে তখন নাম আসে রঞ্জিত অনুসারীদেরই। সে ঘটনায় বিচারবিভাগী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যাদের চিহ্নিত করা হয় সে তালিকায় থাকা স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের এক নেতা এখনও আছেন রঞ্জিত সরকারের সাথে। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায়ও ‘বড় ভাই’ হিসেবে আলোচনায় এসেছে ওই দুজনের নাম। দুই নেতার শক্তিবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় একাধিক প্রাণও ঝরেছে টিলাগড়ে।

একটি ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়। তখন আলোচনায় আসেন দুই নেতা। কিছুদিন তারা ‘ঝিম’ মেরে থাকেন। পরিস্থিতি একটু ঠাÐা হলে আবার তারা ফিরে আসেন স্বরূপে। ত্রাসের রাজ্য প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ অনুসারী কোথাও সমস্যায় পড়লে দুই সেনাপতি ‘হ্যালো’ দিয়ে সেটি সামলে নেন। প্রয়োজন হলে জায়গামতো তদবিরও করেন। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর অনুসারীদের নিয়ে যখন বিপাকে পড়েছিলেন রঞ্জিত সরকার তখন তিনি শরণাপন্ন হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের।

কিন্তু সেখানেও হতাশ হতে হয় তাকে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বিষয়টি নেত্রীর কান পর্যন্ত গেছে, কারও কিছু করার নেই। শেষ পর্যন্ত দ্বারস্থ হন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের কাছে। আগুনের বিষয়ে জল ঢালার দায়িত্ব নাকি নিয়েছিলেন মিসবাহ সিরাজ।

অপরাধ-অপকর্মে অনুসারীদের মাথার উপর ছায়া হয়ে তারা দুজন সব সময়ই আছেন। আবার পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকে তখন তারা রাতারাতি ‘পল্টি’ নেন। অনুসারীদের বাঁচাতে ‘হ্যালো’ দিয়ে আজাদ-রঞ্জিত যাকে নিজেদের লোক পরিচয় দেন, নিজেরা বেকায়দায় পড়লেই সেই তাকেই অস্বীকার করেন। বলেন, চিনি না। তারা তখন শক্ত গলায় বলেন, অপরাধীদের কোনো দল নেই। অপরাধীদের আসলে কোনো দল নেই, মাথার উপর ছায়াও নেই। বিপদে পড়লে ঠিকই তা টের পান অনুসারীরা।

সূত্র : দৈনিক একাত্তরের কথা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ