সিসিক’র ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বারপ্লেট, পকেট ভারি হচ্ছে কার?

জিকরুল ইসলাম;
  • প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫:৫৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৭ মাস আগে

নগরীর বিভিন্ন বাসায় কড়া নাড়ছে কিছু লোক। তারা নিজেদের সিলেট সিটি কর্পোরেশনের লোক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য, বাসার সামনে ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বার প্লেট লাগানো। বিনিময়ে বাসার মালিকদের কাছ থেকে ২’শ টাকা করে নিচ্ছেন তারা। আগন্তুকদের আগমনে অবাক হচ্ছেন নগরবাসী। সিটি কর্পোরেশন থেকে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি, কোনো ধরণের মাইকিং কিংবা আগাম বার্তাও জানানো হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডাবিহীন এই প্রকল্পে পকেট ভরছে নগর ভবনের কর্তাব্যক্তিদের। ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেট বসানোর নামে নগরবাসীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি এনজিও সংস্থা।

নউফ হেলথ এন্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আলমগীর কবির। তার ভাষ্য অনুযায়ী ‘নউফ হেলথ এন্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশন’ যৌথ মূলধন কোম্পানী ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত একটি এনজিও সংস্থা। এই সংস্থার একমাত্র কাজ বাসা বাড়িতে হোল্ডিং নাম্বার প্লেট বসানো। সিলেট মহানগরীর ২৭ টি ওয়ার্ডে ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বার প্লেট বসানোর কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। কোনো ধরণের টেন্ডারে অংশ না নিয়ে শুধুমাত্র নগর ভবনের কর্তাব্যক্তিদের সাথে যোগসাজোশ করে হোল্ডিং প্লেট বসানোর কাজ বাগিয়ে নিয়েছে নউফ।

এই সংস্থার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। হুটহাট বাসা বাড়িতে ঢুকে পড়া এবং বাসার মালিকদের হোল্ডিং প্লেট লাগানোর জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয় নউফ হেলথ এন্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশনের। পাইলট প্রকল্প হিসেবে নগরীর ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডে প্রত্যেক বাসার সামনে ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বার প্লেট বসানোর কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর আরো দুটি ধাপে ১৫ নং ওয়ার্ড পর্যন্ত হোল্ডিং নাম্বার বসায় সংস্থাটি।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১৮ মার্চ সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি পত্রে নউফ হেলথ এন্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশনকে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নং ওয়ার্ডে ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেট স্থাপনের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। সেই পত্রের শর্তাবলীতে, সিটি কর্পোরেশনের সাথে পূর্বের সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক বহাল রাখার পাশাপাশি হোল্ডিং মালিকদের কাছ থেকে ২’শ টাকার বেশি গ্রহণ না করা এবং নম্বর প্লেট বসানোর পর রশিদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। শর্তে আরো বলা হয়, কোন কোন হোল্ডিংয়ের নম্বর প্লেট লাগানো হয়েছে তার তালিকা প্রতি মাসে মেয়রের বরাবরে দাখিল করতে হবে।

ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেট স্থাপন কার্যক্রমে জনসাধারণ কর্তৃক কোনো আপত্তি উত্থাপিত হলে তা সংস্থাটি নিজ দায়িত্বে সমাধান করবে, এ কাজের জন্য নগর ভবন থেকে কোনো অর্থ দাবী করা যাবে না, সম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত হলে মেয়রের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে, প্রতিটি প্লেটে বারকোড থাকতে হবে, ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে তাদের নির্দেশনা ও পরামর্শ মোতাবেক কাজ সম্পাদন করতে হবে, কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে যে কোনো সময় এ কার্যাদেশ বাতিল করতে পারবেন, সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদন না করলে নগর কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এবং নাম্বার প্লেট লাগানো ছাড়া এসেসমেন্ট/কর আদায় ইত্যাদি রাজস্ব সংক্রান্ত কোনো কাজ করতে পারবে না সংস্থাটি।

এনজিওটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারের অনুমতি নিয়েই তারা এ কাজ করছেন। তবে ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের এক স্মারকে উল্লেখিত এনজিওসহ দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে হোল্ডিং অ্যাসেসমেন্ট ও নম্বর প্লেট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। সংস্থাটির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়। সেখানে উল্লেখ ছিলো, ‘এনজিও’র প্রতিনিধিরা নেত্রকোনার একটি উপজেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকজনকে বলছেন, তাদের দেওয়া হোল্ডিং নম্বর ছাড়া ইউনিয়নের কোনো বাসিন্দা জমি রেজিস্ট্রি, ছেলেমেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানো, সরকারি সেবাসহ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেনা বলেও দাবি করছে তারা।’ সংবাদটি প্রচারের পরপরই গাঁ ঢাকা দেয় সংস্থাটির লোকজন।

একইভাবে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নউফ হেলথ্ এন্ড এ্যাডুকেশন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা রিক্সার পেছনের নম্বর প্লেটের মতো একটি ছাপানো নম্বর প্লেট বাড়ি বাড়ি লাগিয়ে একটি ফর্মে পরিবারের কিছু তথ্য সংগ্রহ করে প্রতি পরিবার থেকে ৮০ থেকে ১৬০ টাকা হারে আদায় করছিলো। রসিদে কোন সই-স্বাক্ষর না করে টাকা নেয়ায় এলাকাবাসীর বিষয়টি সম্পর্কে সন্দেহ হয়। বিষয়টি ভুয়া -এ সংক্রান্ত খবর দেখার পর স্থানীয় এলাকাবাসী সচেতন হয়ে ওঠে। মাইকিং করে গ্রামে হোল্ডিং নম্বর লাগানোর নামে প্রতারণা করা হচ্ছে মর্মে প্রচারণা করে এবং স্থানীয় এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতারণাকারিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে। প্রতিবাদকারীরা লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল সড়কে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে।

সিলেট নগরীর ২৭ ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ হাজার বাসা-বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি বাসা থেকে ২’শ টাকা করে আদায় করা হলে সিলেট নগরী থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে এনজিও সংস্থাটি। ইতিমধ্যে প্রায় ৭ হাজার বাসায় ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বার প্লেট বাসিয়েছে তারা।

নউফ হেলথ এন্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশনের মালিক আলমগীর কবির জানান, আমরা দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনে কাজ করেছি। বর্তমানে বিয়ানীবাজার পৌরসভায় ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনে আমরা হোল্ডিং নম্বর প্লেট বসানোর কাজ করছি। এখানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কোনো লাভ লস নেই। এটা থেকে আমি দু বেলা দু মুঠো ডালভাত খাই।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কর ধার্য শাখার এসেসর চন্দন দাশ জানান, ‘এনজিও সংস্থাটি (নউফ) কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল হোল্ডিং নাম্বার প্লেট বসানোর কাজ করেছে। তাই তাদেরকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর কোনো বাধ্য বাধকতা নেই। যদি কোনো ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায় যে নগরবাসীকে জোর জবরদস্তি করা হচ্ছে, তাহলে আমরা সাথে সাথে তাদের বাতিল করে দেবো।’ চন্দন দাশের কাছে ওয়ার্ক অর্ডারের কপি চাইলে তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ক অর্ডারের জন্য আমাদের স্যারদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তাদের পারমিশন ছাড়া তো দেওয়া যাবে না।’

কথা হয় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরীর সাথে। তিনি জানান, ‘কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে সংস্থাটি কাজ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে এখনো কাউকে চাপ প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে আসেনি। দুয়েকটা এসেছিলো। কিন্তু পরে দেখা গেছে এগুলো ভিত্তিহীন।

তারা বাইরে থেকে এসেছে বিধায় অনেকে উল্টো তাদেরকে ডিস্টার্ব করছে। অন্য জায়গায় ৪’শ টাকা করে নিলেও, সিলেটে হোল্ডিং প্রতি ২’শ টাকা করে নিচ্ছে তারা। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতির কোনো কাগজ তারা দেয়নি। যদি মন্ত্রণালয় থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে সেটা আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সূত্র : দৈনিক একাত্তরের কথা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ