প্রো-এক্টিভ পুলিশিং

মোঃ শরিফুল হাসান;
  • প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২০, ৫:৪৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৯ মাস আগে

কমিউনিটি পুলিশিং

ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া বাংলাদেশের পুলিশ। দেশের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ আইনের মতো পুলিশ এ্যাক্ট কিংবা পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল ব্রিটিশদের তৈরি করা যা দিয়ে পরিচালিত হয় পুলিশ। ব্রিটিশদের লক্ষ্যই ছিল কীভাবে উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণকে দাবিয়ে রাখা যায়। তাই শাসকগোষ্ঠী পুলিশকে চিন্তা করেছে পুলিশ ফোর্স হিসেবে, পুলিশ সার্ভিস বা সেবা হিসেবে নয়। শাসকগোষ্ঠীর এই ধরণের চিন্তা চলমান ছিল পাকিস্তান কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও। কিন্তু সময়ের সাথে পরিবর্তন আসে পুলিশেও। চেষ্টা চলে আরো গণমুখী বাহিনী হিসেবে পুলিশকে কীভাবে গড়ে তোলা যায়। তারই প্রচেষ্টা কমিউনিটি পুলিশিং। তবে কমিউনিটি পুলিশের শুরু আরো আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশির দশকে যখন পুলিশের সহিংস আচরণের কারণে জনগণের মাঝে পুলিশের উপর বিশ্বাস কমে যাচ্ছিল, তখনই আলোচিত হয় কমিউনিটি পুলিশিং ধারণাটি। তবে এর আগে ১৮২৯ সালে আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার জনক ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিল গণমুখী পুলিশিং বিষয়ে বলতে গিয়ে পুলিশই জনগণ, জনগণই পুলিশ ধারণাটি নিয়ে আসেন। যার উপর ভিত্তি করে আজকের কমিউনিটি পুলিশিং ধারণা প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহে প্রথম কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু হয়। এর পরের বছর ঢাকা মহানগরীর দুটি থানায় নতুন এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু হয়। আর ২০০৫ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই গণমুখী পুলিশি ব্যবস্থা। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় কমিউনিটির সদস্যগণ, সমাজের বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পুলিশের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিরোধ ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কমিউনিটি পুলিশিং মূলত একটি প্রতিরোধমূলক পুলিশি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় অপরাধের কারণগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। অপরাধের কারণগুলো দূর করা যেহেতু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় তাই এই কাজে অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমিউনিটি পুলিশিং এর যাবতীয় কর্মকান্ড অপরাধ প্রতিরোধ তথা অপরাধ যাতে ঘটতে না পারে সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ জনগণকে নিজ নিজ এলাকার অপরাধগুলো প্রতিরোধ করতে পারে তার জন্য আইনী পরামর্শ দেওয়া, অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করা, অপরাধকর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বা পরামর্শ দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করে। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা পুলিশ ও জনগনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করে। এটি একটি প্রতিরোধমূলক ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক পুলিশী ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় জনগণ এলাকার সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের লক্ষ্যে পুলিশের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ পায়। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়। জনগণের নিকট পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমে এবং জনগনের মধ্যে পুলিশ ভীতি ও অপরাধ হ্রাস পায় এবং জনগণ পুলিশকে সহায়তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়। জনগণের সহায়তায় পুলিশ নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা সমাধানের কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারে। জনগণ পুলিশের কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের আলোকে পুলিশী সেবা নিশ্চিত করা যায়। পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ এ স্লোগান বাস্তবে রুপ নেয়।
প্রতিনিয়ত জনগন কোন না কোনভাবে পুলিশের মুখোমুখি হয়। যেহেতু জনগণের প্রতি পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে, জনগণেরও পুলিশের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তাদেরকে ভয় ও অপছন্দ করা অথবা শুধুমাত্র সমস্যায় পড়ে তাদের কাছে যাওয়া যথেষ্ট নয়। আইনকে সমুন্নত রাখতে জনগণ এবং পুলিশকে একসাথে একযোগে কাজ করতে হবে। তাদের কাজ ও কাজের প্রতিবন্ধকতা; তারা কী করে এবং কিভাবে তা করে; তাদের সংস্থা কেমন এবং সর্বোপরি তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমারেখা বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে, জনগণের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানাও অত্যন্ত জরুরি যাতে করে পুলিশ বা জনসাধারণ কেউই আইন ভঙ্গ করতে না পারে কিংবা অন্যায় করে পার পেয়ে যেতে না পারে। এটাকেই আইনের শাসন বুঝায়। সাধারণত যখন আমরা কোন বিষয়ে জানি তখন তা বলিষ্টভাবে বলতে পারি এবং যখনই আমরা নির্ভয়ে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলি তখন তার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়।

বিট পুলিশিং

পুলিশকে কীভাবে জনমুখী ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায়? প্রতিটি থানার প্রত্যন্ত এলাকাতে কীভাবে পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়? পুলিশের কার্যক্রমে কীভাবে আরও গতি আনা যায় এবং সর্বোপরি বিদ্যমান জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহারের নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পুলিশের কার্যক্রমকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায় এসব বহুমুখী প্রশ্নের সমাধানের পথ হচ্ছে বিট পুলিশিং কার্যক্রম। থানার পুলিশি সেবা জনগণের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছানো এবং পুলিশের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও গণমুখী করার প্রত্যয় নিয়ে ২০১৭ সালে পুলিশের সিলেট রেঞ্জের প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শুরু করা হয় বিট পুলিশিং কার্যক্রম। যেহেতু বিট পুলিশিংয়ের মূল আইনি ভিত্তি-নির্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে শহর এলাকার বাইরে এটি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তার ঘটানো হয়েছে, সেজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সম্প্রসারিত বিট পুলিশিং’। অনেক ক্ষেত্রেই থানার অধিক্ষেত্র অনেক বড় ও যাতায়াত ব্যবস্থাও দুর্গম। থানার অধীনে অনেক ক্ষেত্রে একটি তদন্ত কেন্দ্র বা ফাঁড়ি রয়েছে। অনেক ইউনিয়ন রয়েছে যেগুলো থানা থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার বা আরও দূরে দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এবং যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো নয়। দূরবর্তী এলাকার জনগণ খুব প্রয়োজন না হলে থানায় তেমন একটা আসেন না। আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে অথবা মামলার ঘটনাস্থল না হলে থানা থেকে পুলিশ সেসব এলাকায় নিয়মিত টহল বা অন্যবিধ প্রয়োজনে খুব একটা যেতে উৎসাহী হন না। ফলে জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি হয় যা থেকে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা ও ভুল বোঝাবুঝির। কমিউনিটি পুলিশিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরও ভৌগোলিক দূরত্ব ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ কর্মসূচির অভাবে এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এছাড়া পুলিশের অনিয়মিত উপস্থিতির সুযোগে অপরাধীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রাম্য টাউট ও দালালদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। এলাকা থেকে অপরাধ, অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। বিট পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেফতার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে একটি থানার প্রতিটি প্রান্তে নিবিড় পুলিশিং নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়। ফলে একদিকে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপকৃত হচ্ছে অন্যদিকে পুলিশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হচ্ছে।
প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী জনগণ তাদের প্রয়োজনে সহজেই পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
জনগণ তাদের সমস্যাবলি খুব সহজেই পুলিশকে জানাতে এবং প্রতিকার চাইতে পারবেন। এজন্য ১৫-২০ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করার প্রয়োজন পড়বে না। ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স পর্যন্ত গেলেই হবে। ইউনিয়ন পর্যন্ত পুলিশের উপস্থিতির কারণে এলাকায় অপরাধ, মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার, জঙ্গিদের হুমকি, নারী ও শিশুদের প্রতি অপরাধ প্রবণতা (যেমন- ইভটিজিং, বাল্যবিয়ে) হ্রাস পাবে। বিট কর্মকর্তা স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হবেন। যার মাধ্যমে সমাজে নাগরিকদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। নিজ নিজ বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছেই পুলিশের উপস্থিতি থাকায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ বিরাজ করবে এবং মানুষ অনেকটা আশ্বস্ত থাকবে। পুলিশ কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের অপরাধ চিত্র, অপরাধীদের তথ্য, অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকিসহ গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে। এলাকার টাউট, দালাল, প্রতারক, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাস্তানদের দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম শক্তিশালী হবে। থানায় মোতায়েনকৃত জনবলের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হবে। পুলিশের ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল হবে। এলাকার বিরাজমান দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির সূচনা ঘটবে।
পারিবারিক সহিংসতা বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এর শিকার নারীরা বিট কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করে কিছু প্রতিকার পান। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই এসব নারী থানায় গিয়ে অভিযোগ করার মতো আর্থিক, মানসিক বা সামাজিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন না। জনবহুল বাংলাদেশে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল ভূমি। গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভূমির মালিকানা নিয়ে উদ্ভূত বিরোধ, হানাহানি, খুন তথা ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এসব বিরোধ প্রাথমিকভাবে নিষ্পন্ন করা যায়; যা গুরুতর অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনা হ্রাস করে। ইভটিজিং, যৌতুক, বাল্যবিয়ে ইত্যাদি সামাজিক সমস্যা নিরসন জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা অতি জরুরি। সম্প্রসারিত বিট পুলিশিং এমন একটি মাধ্যম যার সাহায্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে এসব অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়। প্রচলিত ধারার পুলিশিং, যা অপরাধ সংঘটনের পরে কার্যক্রম শুরু করে, তাকে আমরা সাধারণভাবে বলি রিএক্টিভ পুলিশিং। অন্যদিকে অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে বলে প্রোএক্টিভ পুলিশিং বা উদ্যোগী পুলিশিংয়ের একটি কার্যকর হাতিয়ার হল বিট পুলিশিং।

মানবিক পুলিশিং

কমিউনিটি পুলিশিং যেখানে মানুষের সাথে পুলিশের সংযোগ তৈরি করছে, সেখানে মানবিক পুলিশিং সমাজের অবহেলিত মানুষকে মূল গ্রোতে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। নতুন যুগের এই মানবিক পুলিশিং নিঃসন্দেহে জনগণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন নিয়ে আসবে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পুলিশ যত গণমানুষের কাছে যাবে ততই সবার আচরণগত ও মানসিক পরিবর্তন আসবে। সময় বদলে যাওয়ার সাথে সাথে এ পেশাতে আধুনিক মননশীল মেধা ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরাও অনেক বেশি সক্রিয় হচ্ছে। বৃটিশ আমলের পুলিশ মনোভাব কাটিয়ে সরকারের উন্নয়নে পুলিশ বাহিনীর ভুমিকা জন কল্যাণ মুখী করার প্রচেষ্টা চলছে। আর সে প্রচেষ্টাতে সমাজের আইনী সমস্যাগুলোর উত্তরন ঘটাতে মানবিক পুলিশিং এর বিকল্প কিছু নেই। পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে আস্থা এবং বিশ্বস্ততা তৈরীর প্রাক শর্ত হলো পুলিশকে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে পুলিশ এবং জনগণ অপরাধ প্রতিরোধ, শান্তি শৃঙ্খলা বজায়, এবং অন্যান্য সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পুলিশ তাঁদের প্রত্যাশাগুলো সন্তোষজনক পর্যায়ে সম্পন্ন করতে পারবে না। যেহেতু পুলিশ একা পর্যাপ্ত নয় তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং যে কমিউনিটিকে তাঁরা সেবা প্রদান করেন তাঁদের মধ্যে অংশীদারিত্ব তৈরী হলে জীবন এবং সম্পত্তি রক্ষায় উভয়ই কাজ করতে পারবে। সময় বদলে যাওয়ার সাথে সাথে পুলিশে আধুনিক মননশীল মেধা ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরাও অনেক বেশি সক্রিয় হচ্ছে। বৃটিশ আমলের পুলিশ মনোভাব কাটিয়ে সরকারের উন্নয়নে পুলিশ বাহিনীর ভুমিকা জন কল্যাণ মুখী করার প্রচেষ্টা চলছে। আর সে প্রচেষ্টাতে সমাজের আইনী সমস্যাগুলোর উত্তরন ঘটাতে মানবিক পুলিশিং এর বিকল্প কিছু নেই। যার মাধ্যমে জনগনকে আপন করে নেবার পাশাপাশি অযথা হয়রানি করার মনোভাব ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে করোনাকালীন সময়ে। উর্ধতন কর্মকর্তারা যখন ন্যায়ের পথ চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠে তখন তাকে দেখে শিক্ষা নেয় অধীনস্তরা।
পুলিশের পক্ষে ১৬ কোটি মানুষের দেশে নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে। কমিউনিটি পুলিশংয়ে সাধারণ মানুষের সেই অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। আর কমিউনিটি পুলিশের কমিটির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে পুলিশের একটি সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। পুলিশ সমাজের সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি। অথচ পুলিশই সমাজে নেতিবাচক উপস্থাপিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পড়ে। অথচ কোন ভবনে আগুন লাগলে, দমকলের আগে হয়ত পুলিশকে গিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা হলে, হাইওয়ে পুলিশকে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের লাশ নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে হয়। মানুষ তার বিপদে সবার আগে পুলিশের কাছে যায়। বিপদে সবার আগে পেলেও, পুলিশের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে সব সময়ই প্রশ্নের মধ্যে থাকে কয়েক জন পুলিশের মন্দ কাজের জন্য। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম পুলিশের ইতিবাচক কাজের চেয়ে নেতিবাচক কাজের প্রচারকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। জনগণের মধ্যে পুলিশকে নেতিবাচকভাবে দেখার ফ্রেমিং তৈরি হয়। আর যখন পুলিশ তৃণমূল মানুষের কাছে গিয়ে তার সমস্যা শুনছে, উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হচ্ছে, তখন জনগণের মধ্যেও পুলিশকে নিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি হতে শুরু করে। করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের অগ্রনী ভূমিকা ইতিমধ্যে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানবিক পুলিশিং এর গল্প সবার মুখে মুখে, অনেকেই বলছেন করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশকে নতুন করে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন তারা এবং সেটি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই। মানবিক পুলিশের অনন্য উদাহরণ হিসেবে করোনা সংকট মোকাবেলায় পুলিশের বৈচিত্র্যময় ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, সংস্কৃতি, অভিবাসন, অভিগমন ইত্যাদিকে বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে যখন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনগণবান্ধব জনমুখী দায়িত্ব পালনে ব্রতী হয় ঠিক তখনই মানবিক পুলিশিং এর চর্চা অব্যাহতভাবে লক্ষ্য করা যায়। কমিউনিটি পুলিশিং এই আস্থাকে আরো সমুন্নত রাখতে সহায়তা করছে। কমিউনিটি পুলিশিং যেখানে মানুষের সাথে পুলিশের সংযোগ তৈরি করছে, সেখানে মানবিক পুলিশিং সমাজের অবহেলিত মানুষকে মূল গ্রোতে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। নতুন যুগের এই দুই পুলিশিং নিঃসন্দেহে জনগণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন নিয়ে আসবে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

পরিশেষে পুলিশ প্রবিধান ৩৪ বিধিতে বলা হয়েছে চাকরিরত সকল পুলিশ অফিসার নিজ নিজ এলাকায় বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবেন। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লাগবে। সমগ্র পুলিশবাহিনীকে একটি অবিভাজ্য টিম হিসেবে কাজ করার জন্য এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে সময় এসেছে এখনই ভেবে দেখার।

 

  • মোঃ শরিফুল হাসান
  • লেখক ও গবেষক
  • ট্রাফিক  সার্জেন্ট, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ