গা ছাড়া সিলেট

সাঈদ চৌধুরী টিপু;
  • প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২০, ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১ বছর আগে

সাদাপাথরে স্বচ্ছ টলমলে জলে গা ভেজানোর দৃশ্যটি গেলো কয়েকটি ঈদে একেবারে চেনা দৃশ্য হলেও করোনাকালের ঈদে দৃশ্যটি একেবারে বেমানান। করোনার সংক্রমণ এড়াতে যেখানে বারবার বলা হচ্ছে জনসমাগম এড়ানোর কথা, সেখানে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর, গোয়াইনঘাটের জাফলংসহ সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভিড় ছিলো চোখে পড়ার মতো। স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো গরজই নেই কারো। মানানোর দায়ও যেনো নেই কারো কাঁধে। অথচ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন-ঈদের সময়ের এই লাগামছাড়া পরিস্থিতি বিপদ আর বাড়িয়ে তুলতে পারে। সরকারও তাই বিধিনিষেধের মেয়াদ আরেক দফা বাড়িয়েছে। সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।
সরকারি এই বিধিনিষেধ ‘কাজির গরুর’ মতো ‘কেতাবেই আছে গোয়ালে নেই’। কেউই মানছে না, মানানোর ব্যবস্থাও চোখে পড়ছে না। বিধিনিষেধ আগে থেকেই রয়েছে সোমবারের প্রজ্ঞাপনে এর মেয়াদ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সোমবারের প্রজ্ঞাপনে বাড়ির বাইরে বের হলেই মাস্ক পরা ও পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেউ এই নিয়ম অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়। এছাড়া রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে জরুরি প্রয়োজন বলতে বোঝানো হয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিংবা ওষুধ কেনা, কর্মস্থল, জরুরি পরিষেবার চলাচল, চিকিৎসা সেবা এবং মৃতদেহ দাফন/ সৎকারের কাজে যাতায়াত। প্রজ্ঞাপনে অফিস-আদালত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও সব স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্ত দেওয়া হয়েছে। হাটবাজার, দোকানপাট ও শপিং মলগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রবেশমুখে সবার তাপমাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করার ব্যবস্থা রাখতে। পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি শপিংমলে আসা যানবাহনগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ সময়ে গণপরিবহনগুলো পারস্পরিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে পারবে। এ সময়ের মধ্যে কোনো সভা-সমাবেশ, অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাবে না।

প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলোর কোনোটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না সিলেটে। এই যে যারা ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে এখানে-ওখানে যাচ্ছেন, তারা কিন্তু গণপরিবহণই ব্যবহার করছেন। যেখানে মানা হচ্ছে না পারষ্পরিক দূরত্ব। হাট-বাজারের অবস্থা তো সাধারণ সময়ের মতো গিজগিজ করছে লোকজনে। ক্রেতা-বিক্রেতা কারো মাঝেই সচেতনতা নেই। মাস্ক পড়ায় আগ্রহ নেই ক্রেতাদের, শপিংমল-দোকানপাটে তাপমাত্রা মাপা বা হাত পরিষ্কারের ব্যবস্থা নেই। দোকানপাট খোলা রাখার সময় সন্ধ্যা ৭টা থেকে বাড়িয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে নগরীর দোকানপাটগুলো ১২টা পর্যন্তও খোলা থাকতে দেখায়। রাত ১০টার পর বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরুতে মানা থাকলেও গভীর রাতেও নীরব হয় না রাজপথ। সভা-সমাবেশ, অনুষ্ঠান আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে সভা হচ্ছে, জনসমাগম ঘটছে। বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও চোখে পড়ছে ভালোই। দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে সাধারণের মনের ভয় যেনো কেটে গেছে। সবখানেই তাই গা-ছাড়া ভাব।

বিধিনিষেধগুলো বেশিরভাগ কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন সমাজসচেতনরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। এ কারণে এই বিধিনিষেধগুলো মানতে জন সম্পৃক্ততা তৈরি করা যাচ্ছে না। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সিলেট চ্যাপ্টারের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী একাত্তরের কথাকে বলেন, সমাজের প্রতি দায়বোধ না থাকলে কোনো আইন বা বিধির প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যদি জন-সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে কাগজে কলমে এসব নিয়ম জারির কোনো মানে নেই। বিধি নিষেধ জারি করলেও সেগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারকদের ঘাটতি রয়েছে বলেই তিনি মনে করেন। তিনি বলেন এই যে বিধিগুলো মানতে বলা হচ্ছে-আন্তরিকভাবে চাইলে অবশ্যই তা মানানো যেত। আমরা তো কোথাও এর প্রয়োগ দেখছি না। যদি তিনি বলেন, জনসাধারণকে সচেতনস হতে হবে পাশাপাশি আইন-বিধান প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকেও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আর এটা না হলে এগুলো কথার কথাই থাকবে। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে খুব একটা সহায়ক হবে না। কারণ নীতি নির্ধারকদের ওপরই নির্ভর করবে জনগণ মানবে কি মানবে না।

প্রশাসনের সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান বলেন, পর্যটন স্পটগুলোতে ভিড় বাড়ায় মঙ্গলবার জাফলংয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অন্যান্য স্পটেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি জানান।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন এ সকল অভিযানে পুলিশ প্রশাসনকে সহায়তা করছে।

সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, জেলা পুলিশের উদ্যোগে মানুষকে সতর্কীকরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, জেলা পুলিশ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যটন স্পটগুলোতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাজারে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে করোনা পরিস্থিতিতে থাককে থাকতে মানুষের মাঝে সংক্রমণের ভয় ও আতঙ্ক কমে গেছে। তিনি বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি যে, ব্যাপকহারে মানুষ বাইরে বের হচ্ছে, ভিড় বাড়াচ্ছে। জেলা প্রশাসন কাজ করছে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নে তারপরও মানুষ যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানে সেক্ষেত্রে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হতে পারে।

 

সূত্র- একাত্তরের কথা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ