বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বিড়াল’ ও আজকের সমাজ ব্যবস্থা

অহী আলম রেজা;
  • প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২০, ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ৯ মাস আগে

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। তিনি বাংলা উপন্যাসের প্রথম সার্থক স্রষ্টা। ‘সাহিত্যসম্রাট’ হিসেবে পরিচিত বঙ্কিম বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ। যারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বীয় কীর্তি দ্বারা অমর হয়ে অাছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় অন্যতম।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের হাস্য- রসাত্মক ও ব্যঙ্গধর্মী রচনার সংকলন ‘ কমলাকান্তের দপ্তর’। তিন অংশে বিভক্ত গ্রন্থটিতে যে কটি প্রবন্ধ রয়েছে তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘বিড়াল’।  একটি বিড়ালকে রুপক হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদ ও অধিকারকে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়৷

সাম্যবাদবিমুখ ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় বিড়ালের মুখ দিয়ে শোষক- শোষিত, ধনী -দরিদ্র, সাধু- চোরের অধিকারের কথা শ্লেষাত্মক, যুক্তিনিষ্ট ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন।

রচনার শুরুতে দেখা যায়, আফিংয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে শয়নগৃহে চৌকির উপর বসে কমলাকান্ত ওয়াটার্লু যুদ্ধ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ বিড়ালের একটা ‘মেও’ শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে। কমলাকান্ত দেখেন তার জন্য প্রসন্ন গোয়ালিনীর রেখে যাওয়া দুধটুকু এই বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। কমলাকান্ত ভাবেন, দুধে তার নিজের যেমন অধিকার অাছে, তেমনি বিড়ালেরও সমান অধিকার। কারণ দুধ তার নয়, দুধ হলো গাভীর। তবুও নিজের শ্রেষ্টত্ব প্রকাশের জন্য তিনি বিড়ালটিকে লাঠিপেটা করতে উদ্যোত হন। এমন সময় দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে কমলাকান্ত বিড়ালের কথা শুনতে পান। বস্তুত তাঁর নিজের বিবেকই বিড়ালের পক্ষে কথা বলে। বিড়াল এ সংসারের ক্ষীর, সর, দুধ, দই, মাছ, মাংসে তাদের অধিকারের কথা কমলাকান্তকে জানিয়ে দেয়। কারণ মানুষের মতো তাদেরও ক্ষুধা তৃঞ্চা অাছে। বিড়াল বলে, ‘ খাইতে পাইলে কে চোর হয়। বিড়ালের মতে, তার চৌর্যবৃত্তির প্রধান কারণ ধনীদের কৃপনতা। ধনীরা তার খাবার ব্যবস্থা করলে সে চুরি করত না। চুরির কারনে যে অধর্ম হয় তার জন্য বিড়াল দায়ী করেছে ধনীকে। বিড়ালের দাবি, ধনীর দোষেই দরিদ্র চোর হয়। ধনীরা দরিদ্রকে খেতে না দিলে দরিদ্র চুরি করেই যাবে। অার এ চুরির জন্য দরিদ্রের দণ্ডের বিধান সত্বেও কার্পন্যের জন্য ধনীদের দণ্ড না হওয়ায় বিড়ার প্রশ্ন তুলে। তার দাবি, চোরকে সাজা দেওয়ার অাগে বিচারককে তিনদিন উপোস করতে হবে। এতে যদি বিচারকের চুরি করে খাবার খেতে ইচ্ছে না করে তবেই যেন চোরের দণ্ড প্রদান করেন।

ক্ষুধা তৃঞ্চার অনুভূতি সকল প্রাণিই সমান অনুভব করে। ‘ বিড়াল’ রচনায় বিড়ালের অনুযোগের মাধ্যমে লেখক চৌর্যবৃত্তির অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করেছেন।

এ রচনায় কমলাকান্ত ও বিড়ালের মধ্যে কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার কঠোর নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। যা অাজও সমাজে বিদ্যমান। ধনীরা গ্রাস করছে গরীবের সম্পদ। রচনায় বিড়ালের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে পৃথিবীর সব বঞ্চিত, নিষ্পেষিত, দলিতের ক্ষোভ – প্রতিবাদ। বিড়ালের তীক্ষ্ণ যুক্তির কাছে কমলাকান্ত অনেকটাই পরাজিত হয়েছেন।

পৃথিবীর মানুষ কিছু লৌকিক অধিকার নিয়ে জন্মায়। এই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা চরম নির্মমতা। ‘বিড়াল’ রচনায় বিড়ালের মতো শোষিত শ্রেণিকে ধনিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ধণিক শ্রেণির এমন অাচরনে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য বাড়তে থাকে। তাই লেখক বিড়ালের জবানীতে ধনিক শ্রেণির এই অাচরনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সমাজে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

অহী আলম রেজা
প্রভাষক, বাংলা
বালাগঞ্জ সরকারি কলেজ

 

 

 

প্রিয় পাঠক, আপনিও সিলেটডায়রি’র অংশ হয়ে উঠুন। স্বাস্থ্য, শিল্প ,সাহিত্য, ক্যারিয়ার, পরামর্শ সহ যেকোন বিষয় নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ