জাফলংয়ের পিয়াইন নদী খনন সময়ের যৌক্তিক দাবি

ফয়েজ আহমদ বাবর;
  • প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২০, ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১০ মাস আগে

জৈন্তিয়া ব্রিটিশের শেষ স্বাধীন রাজ্য, (ব্রিটিশ অধিভুক্ত সর্বশেষ স্বাধীন রাজ্য) ঐতিহ্য, গৌরবদীপ্ত এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জৈন্তিয়ার ১৭ পরগনার এক ঐতিহ্যবাহী পরগনার নাম জাফলং। জাফলং আল্লাহর সৃষ্টির অপরূপ মহিমা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলছে ঝরনা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি।

মেঘালয়ের মেঘের খেলায় প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য প্রকৃতি কন্যা জাফলং। যার অপর পাশে ভারতের ডাউকি অঞ্চল। ভারতের মেঘালয়ের স্বচ্ছ পানির জীবন্ত অ্যাকুয়ারিয়াম খ্যাত ‘উমগট’ নদী থেকে ডাউকি নদী। ডাউকি নদী জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পিয়াইন নদী নামে পরিচিত হয়েছে। মূলত পিয়াইন নদীর অববাহিকায় জাফলং অবস্থিত।

জাফলং-এর পাথর শিল্প একদিকে যেমন ঐ এলাকাকে সকল অঞ্চলের কাছে পরিচিত করেছে, তেমনি এই পাথর শিল্পের যথেচ্ছ বিস্তারে এলাকা বিভিন্ন দূষণের দূষিত হচ্ছে হরদম। সরকারি বিধিনিষেদের তোয়াক্কা না করে নদী থেকে যাচ্ছে পাথর উত্তোলন নদীর জীববৈচিত্র্য আর উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে করে তুলেছে হুমকির সম্মুখিন। এছাড়া অনুমোদনহীন ভাবে ৩০-৩৫ ফুট গর্ত করে পাথর উত্তোলন নদী এবং নদী অববাহিকার ভূমিকে করছে হুমকির সম্মুখিন। তাছাড়া উজান থেকে নেমে আসা পাথর আর বালুতে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় পিয়াইন নদীর নাব্যতা কমে গেছে। ফলে হঠাৎই উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নিকটবর্তি অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা।

মেঘালয় থেকে ধেয়ে আসা ঢলে নদী তীরবর্তী অনেক গ্রাম মহল্লা নদী ভাংগনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে গেছে, বিডিআর ক্যাম্পসহ বেশ কিছু এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে চা-বাগানসহ বস্তি। এছাড়া নিষিদ্ধ “বোমা মেশিন” দিয়ে যত্রতত্র নদী থেকে পাথর উত্তোলনের কারণে স্থানীয় পিয়াইন নদী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিপুল সম্পদের অপচয়ও পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে রুটিন মাফিক। অপরিকল্পিত ভাবে ড্রেজার দিয়ে পাথর, বালু উত্তোলনের জন্য নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে প্রতিশোধ নিয়ে তার পথ আবিষ্কার করতে যেয়ে হয়ে উঠছে দানব। এটা মানুষের প্রতি প্রকৃতির প্রতিশোধ। পরিবেশের এই সকল ইভেন্টের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে পিয়াইন নদী খনন করা সময়ের উপযুক্ত দাবি।

ডাউকি থেকে বাংলাদেশের ভিতরে পিয়াইন নদী দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি পূর্ব দিকে মুখতলা হয়ে গোয়াইন নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। অন্য দিকে পশ্চিম দিকে হাজীপুর-পান্তুমাই হয়ে হাদারপার হয়ে-কোম্পানি গন্জে কাটা গাং হয়ে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে।

প্রবীণ লেখক, রাজনীতিবিদ এবং নিরলস সমাজকর্মী বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এম. তৈয়বুর রহমান “পিয়াইন নদী খনন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ” প্রসঙ্গে ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম দরখাস্ত করেন। ১৯৮৩ সালের এবং সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের ২৬শে মে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন এবং নিবেদন করেন। জৈন্তিয়ার এই গুণী মানুষ এম তৈয়বুর রহমান মনে করতেন লক্ষ লক্ষ জনজীবনের সহায় সম্পদ ক্ষতির সাথে সংশ্লিষ্ট উত্তর সিলেটের বিস্তীর্ণ জনপদ একদিন প্রায় ধ্বংস হয়ে যাবে তাই পিয়াইন নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন অতীব জরুরী। তার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন চিন্তাধারায় আজকে ২০২০ সালের জাফলং এর দিকে তাকালে মনে হয় পূর্বের যদি পিয়াইন নদী খনন করা হতো তাহলে আজকে আর এই পর্যটনের নয়নাভিরাম দৃশ্যের প্রকৃতি কন্যা জাফলং কে কঙ্কালসার হিসাবে দেখতে হতো না।

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা রক্ষায় ‘ড্রেজিং মাস্টার প্ল্যান’ করা হয়েছে। ৫০,০০০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭৮ টি নদী খনন করে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ চলাচলের উপযোগী করা হবে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানোর উপায় নেই৷ বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই টিকে আছে৷ কিন্তু অন্যান্য দুর্যোগের সঙ্গে নদী ভাঙনের পার্থক্য হচ্ছে, ভাঙন কবলিত মানুষ এক ধাক্কায় পায়ের নীচের মাটিটুকুও হারিয়ে ফেলে৷ বন্যায় সব ধুয়ে গেলে, ঘূর্ণিঝড়ে উড়ে গেলেও ভিটেমাটিটুকু থাকে৷ কিন্তু নদীভাঙনে সেটুকুও থাকার জো নেই৷

বাংলাদেশে যে নদী ভাঙন, তা নিছক প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া নয়৷ দীর্ঘ অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতা। নদীকে বশে রাখতে হলে একদিকে যেমন পাড় বাঁধতে হয়, অন্যদিকে প্রয়োজন হয় প্রবাহ যাতে মাঝনদী বরাবর থাকে, প্রবাহের জন্য যাতে পর্যাপ্ত গভীরতা থাকে; সেই ব্যবস্থা করা৷ দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে নদী শাসনের কাজ বরাবরই ‘একচোখা’৷ পাড় বাঁধার দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়, প্রবাহকে মাঝনদীতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তার সিকিভাগও নয়৷ বালি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ উপাদান। বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পে এর বিপুল চাহিদা রয়েছে। নদী ভরাটে শুধু বালি থাকে না, থাকে পলি, কাদা ও নুড়িপাথর। বালির মতো এই পলি, কাদা ও নূড়িপাথরের বিশেষ ব্যবহার আছে। এই ব্যবহার বিষয়ে সঠিকভাবে কতৃপক্ষ কে অবহিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নদী খনন অংশগ্রহণমূলক করা সম্ভব।

অংশগ্রহণ মূলক নদী খনন প্রক্রিয়া ছাড়া জাফলং পিয়াইন নদীকে রক্ষার আর কোনও বিকল্প পথ নেই। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষের সহায় সম্পদ রক্ষা এবং গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নদী ভাঙ্গন রোধ এবং সর্বোপরি প্রকৃতি কন্যা জাফলং এর নয়নাভিরাম দৃশ্য ফিরিয়ে আনতে পিয়াইন নদী খনন এখন সময়ের যৌক্তিক দাবি।

 

লেখক-ফয়েজ আহমদ বাবর

 লেখক-ফয়েজ আহমদ বাবর

সহকারী অধ্যাপক
জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজ

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ