মৌলভীবাজার জেলা কারাগার, যেখানে অনিয়মই নিয়ম

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি;
  • প্রকাশিত: ৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ৭:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

মৌলভীবাজার জেলা কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে দাপটের সাথে। বন্দীদের অভিযোগের যেন শেষ নেই। অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মৌলভীবাজার জেলা কারাগারে বিরুদ্ধে সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য ও বন্দীদের খাবার চড়া দামে কেন্টিনে বিক্রিসহ নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন জেলা কারাগারের কর্মকর্তাসহ কারারক্ষীরা।

সদ্য নাশকতার মামলায় হাজতে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বন্দির পিতা জানান, তার ছেলে প্রায় ১ মাস ধরে একটি মামলায় কারাগারে রয়েছে। ছেলের প্রতি মাসের চাহিদা মেটাতে নগদ টাকা প্রয়োজন হলে কারাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠান তিনি। সেক্ষেত্রে বিকাশে প্রতি হাজারে কারা কর্তৃপক্ষকে কমিশন দিতে হয় ২০০ টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার টাকা তার বন্দী ছেলের জন্য পাঠালে সে পায় ৮০০ টাকা। সপ্তাহে একদিন সাক্ষাৎ নিয়ম থাকলেও প্রতিদিন ৫০০ টাকার বিনিময়ে করা যায় সাক্ষাৎ। প্রতিদিন এভাবেই বন্দীর স্বজনদের কাছ থেকে কারাগারের কর্তৃপক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায় বন্দীদের দেখতে আসা স্বজনদের কাছ থেকে।

কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া শয়ন তাঁতী (শিক্ষক), রিপন রায় (জন প্রতিনিধি), নামের দুই ব্যক্তি জানান, কারাগারে হাসপাতালের বেড পেতে হলে অসুস্থ হওয়া জরুরি নয়। কোনো নিয়ম ও বিধি অনুসরণেরও প্রয়োজন নেই। প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা দিলেই সুস্থ বন্দীদের দিয়ে দেওয়া হয় কারা হসপিটালের বেড। আর অসুস্থ বন্দীরা কম্বল বিছিয়ে থাকেন মেঝেতে। কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো রোগী যদি সাহস করে মুখ খোলে তাহলে তাদের উপর চলে নির্যাতন। এভাবে ১০-১২ জনের অধিক প্রভাবশালীদের মাসের পর মাস মেডিকেলে রেখে সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও জানান তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারারক্ষী জানান, কারাগারের ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকায় বন্দিদের কাছে খাবার বিক্রি করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কারাগারের কর্তৃপক্ষ। বন্দীদের বরাদ্দকৃত খাবার পরিমাণে কম দিয়ে গুদামে বোঝাই করে পূর্ণরায় দেখানো হয় বিল ভাউচার। বন্দীদের তেল, সাবান ক্যান্টিনে নিয়ে বিক্রি করে বাহির থেকে বানিয়ে আনা হয় কেন্টিনের নামে বিল ভাইচার। আর এসব কাজ করেন অসীম পাল ও কিবরিয়া নামের দুই কারারক্ষী তাদের মাধ্যমেই বিল ভাউচার সংগ্রহ করে ক্যান্টিনের নামে ক্রয় দেখানো হয় পণ্যগুলোর। বন্দীদের প্রতিটি পণ্য কিনতে হয় বাজার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দাম দিয়ে।

এ ছাড়াও তাদের কারা ক্যান্টিনের বিক্রি বাড়ানোর জন্য সরকারি খাবারের নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে বন্দীদের দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খাবার। যা খাওয়ার উপযোগী নয় বলেও জানান অনেকেই। কিনেই যদি খেতে হয় সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের খাবার মাছ, মাংস ও ডিম তাহলে বরাদ্দের সরকারি খাবার যায় কোথায়। এমন প্রশ্ন অনেকের মাঝে বিরাজ করছে।

তারা আরও জানান, শুধু তাই নয় কারাগারের সরকারি খাবার নিম্নমানে হওয়াতে অনেকই এমন খাবার খেতে নারাজ। টাকা হলেও মিলে ভিআইপি খাওয়া-দাওয়ায়ও রাজকীয় ভাবে। কারা ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীর সহযোগিতায় বাইরে থেকে মাছ, মাংস, ডিম, ফল ও সবজি কিনে এনে দুই বেলা বিক্রি হয় ডায়েড নামের খাবার। বিক্রি হয় ১টি ডিম ৭০ টাকা, ১ পিস পোনা মাছ ১০০-১২০ টাকায়,সবজি ৬০ টাকা। চৌখার মাধ্যমে বন্দীদের দিয়ে রান্না করে সরবরাহ করা হয় এসব ডায়েড নামীয় খাবার বন্দীদের কাছে। ডায়েড বিক্রি, সিট বাণিজ্যের ব্যাপারে সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন কারাগারের জেল সুপার মো. মুজিবুর রহমান মজুমদার।

আদালতে হাজিরা দিতে আসা কয়েকজন আসামি অভিযোগ করে জানান, কারাগার থেকে ৭ দিন পরপর ফোনে স্বজনদের সাথে কথা বলার নিয়ম থাকলেও টাকার বিনিময়ে প্রতিদিন কথা বলার সুযোগ রয়েছে কারাগারের কর্তৃপক্ষের কাছে।

কারাগারে বন্দী আসামিরা জানান, কারাগারের টেলিফোন অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে ইয়াবা কারবারিদের কাছে। আর এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাদকের অভিযোগে চাকুরিচ্যুত হয়ে চাকরি ফিরে পাওয়া কারারক্ষী ইকবাল ও আইদ্দুস হাতে। এ ছাড়াও জেল গেইটে দাঁড়িয়ে আইদ্দুস নামের কারারক্ষী স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ এর জন্য আসা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে নিয়ম ভেঙেও টাকা হাতিয়েও নিচ্ছেন।

মৌলভীবাজার জেলা কারাগারের এমন অনিময় দুর্নীতির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন সদ্য যোগদানকারী জেল সুপার মো. মুজিবুর রহমান মজুমদার। দুদকের ঢাকা অফিসের এক বড়কর্তা নাকি তার নিকট আত্মীয় বলে তিনি পরিচয় দিয়ে থাকেন। পূর্ববর্তী একটি কারাগারে তিনি জেল সুপার থাকা অবস্থায় দুদক কর্মকর্তাকে জেলে তদন্তের জন্য প্রবেশ করতে দেননি বলে দম্ভ করে বেড়ান।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন জেল সুপার মো. মুজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, আমি হবিগঞ্জে আছি। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।

এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় কারা উপ মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়ার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক এ ব্যাপারে খতিয়ে দেখবো। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. জুবাইর হোসেনের মৌলভীবাজার জেলা কারাগারে (ভারপ্রাপ্ত) জেলার হিসেবে যোগদান করেছে উনার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলুন।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি