সব
এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটি নিয়েই সিলেটের সর্বমহলে নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে। এ-ই কমিটি নিয়ে সিলেটে সমালোচনার ঝড় বইছে। দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিতর্কের জন্ম হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে ঘিরে।
কলেজের ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ছাত্রাবাসের হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে। অথচ মূলত তার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের কয়েকটি ব্লক দখল করে রাখে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। তাঁর নিজের ব্যবহৃত বাংলোই ছিলো ছাত্রলীগের দখলে। অপরাধের জলসাঘর বানিইয়ে রাখা হয়েছিলো সেই বাংলো।
জামাল উদ্দিনকে রাখা হয়েছে তদন্ত কমিটিতে, অথচ নিরাপত্তা পালনে গাফিলতির অভিযোগে ছত্রাবাসের দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
জামাল উদ্দিন এমসি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অভিযোগ আছে বছরের পর বছর ধরে তিনি নিজেই বিনা ভাড়ায় সরকারি বাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মকর্তা সরকারি বাড়ি ব্যবহার করলে তিনি বেতনের সাথে আর বাড়ি ভাড়া দাবি করতে পারবেননা।
বরং বাড়ি ব্যবহার করার কারনে তার বেতন থেকে বাড়ি ভাড়ার টাকাসহ বাড়ির রক্ষাণাবেক্ষণ বাবদ আরো ৭.৫% কর্তন করা হয়। কিন্তু জামাল উদ্দিন ছাত্রাবাসের দুটি বাংলো দখলে রাখেন। এ-র মধ্যে তৃতীয় ব্লকের বাংলোটি ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে তিনি ব্যবহার করছেন। আর ৫ নম্বর ব্লকের বাংলো তিনি ছেড়ে দেন ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী ছাত্রলীগের সাইফুরের কাছে।
সাইফুর এই বাংলো অপরাধ আস্থানা হিসেবে পরিনত করেছিলো। নিয়মিত সেখানে বসতো মাধক আর নারী আড্ডা। আর জামাল উদ্দিন বাড়ি ব্যবহার করেও মাসিক বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়াও তুলে নিচ্ছেন – এমন তথ্যই নিশ্চিত করেছে কলেজ প্রশাসনের একটি সূত্র। এসব বিষয় জানতে চাইলে জামাল উদ্দিন কলেজ অধ্যক্ষের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে সাইফুর যে হোস্টেল সুপারের বাংলো ব্যবহার করে অপরাধ আস্থানা গড়ে তুলেছিলো তা অকপটে স্বীকার করেন তিনি। বাংলো দখলে নিয়ে নানা অপকর্ম জানার পর তিনি সাইফুরের বিষয়ে কলেজ প্রশাসনকে অবগত করেছেন বলেও জানান। গত ঈদের পর অধ্যক্ষ সালেহ আহমেদ সাইফুরকে ডেকে এনে শাসিয়েছেন বলেও জানান জামাল উদ্দিন। কিন্তু বিষয়টি কলেজ প্রশাসন এমনকি কলেজ প্রধান অবগত হওয়ার পরও সাইফুর কিভাবে হোস্টেল সুপারের বাংলো ব্যবহার করতো- এই প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
যার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তাকে কমিটিতে রাখার বিষয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ বলছেন, কলেজের ছাত্রাবাসে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা ন্যক্কারজনক। এই ঘটনায় আমরাও হতবাক। হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে কমিটির সদস্য রাখা হয়েছে কারণ তিনি এই ছাত্রাবাসের অনেক পুরাতন হোস্টেল সুপার। তার অনেক বিষয় জানা রয়েছে। অতীতে কী হয়েছে আর বর্তমানে কীভাবে কী ঘটনা ঘটেছে তা জানার জন্য তাকে রাখা হয়েছে। অন্য কোনও কারণ নেই।
দায়িত্ব পালনের অবহেলার অভিযোগে ছাত্রাবাসের দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের কাজ হলো ছাত্রাবাসের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করা। ছাত্রাবাসের ভেতরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অথচ তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় জরুরি বৈঠকে বসে রাসেল মিয়া ও সবুজ আহমদকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা মাস্টার রোলে চাকরি করতেন।
অধ্যক্ষ বলেন, কমিটি যাতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করে সেজন্য সবার পরামর্শ অনুযায়ী কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে আহ্বায়ক রাখা হয়েছে। আর ছাত্রাবাসের বিস্তারিত বিষয় জানার জন্য হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব নেওয়া আরেক হোস্টেল সুপার কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জীবন কৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এমসি কলেজের অধ্যক্ষ আরও বলেন, তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। ছাত্রাবাস থেকে দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করা হলেও হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, এমসি কলেজ হোস্টেল সুপারের বাংলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অবস্থান করছে ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। তার দখলে থাকা ওই বাংলো থেকেই পুলিশ শুক্রবার একটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি রামদা, একটি ছুরি ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় শাহপরাণ থানার এসআই মিল্টন সরকার বাদী হয়ে সাইফুরকে একমাত্র আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে এমসি কলেজ বন্ধ থাকলেও ছাত্রাবাস খোলা ছিল। ছাত্রাবাসে শুধু সাইফুর নয় হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছাত্রাবাসে থাকতো অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন থেকে ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের কর্মীরা নানা ধরনের উৎপাত করলে হোস্টেল সুপার একেবারেই নীরব ছিলেন।
উল্লেখ্য, শুক্রবার এমসি কলেজে ঘুরতে আসা এক দম্পতিকে আটক করে জোর করে ছাত্রাবাসে তুলে আনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরপর গৃহবধূর স্বামীকে বেঁধে মারধর করে ওই তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে সাইফুরসহ অন্যরা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী শুক্রবার রাতে বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় মামলা করেছেন। মামলায় এজাহার নামীয় আসামি করা হয়েছে ৬ জনকে। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলো এম. সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেক আহমদ, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান। এরা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আসামিদের মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত, বাকিরা এমসি কলেজের ছাত্র। এ-র মধ্যে প্রধান আসামী সাইফুর এবং অর্জুনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি