সব
সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। আলোচিত এ গণধর্ষণের ঘটনায় সাইফুরকে প্রধান আসামি করে ৮ জনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য প্রসিকিউশনের কাছে অভিযোগপত্র হস্তান্তর করেন। পরে তা আদালতে দাখিল করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার ৬৯ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করলো পুলিশ। অভিযুক্ত ৮ জনই বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন।
এজহার নামীয় আসামিদের মধ্যে ৬ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষনে অংশ নেয়া ও বাকি ২ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহায়তার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট আদালতে অভিযোগপত্র প্রদান করার পর দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দেয় সিলেট মহানগর পুলিশ। নগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ)-এর কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণের উপ কমিশনার সুহেল রেজা জানান, তদন্ত কর্মকর্তা সকল তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে অভিযোগপত্র তৈরী করেছেন। পরবর্তীতে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও খতিয়ে দেখেন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে বুধবার সন্ধ্যায় এসএমপি কমিশনার নিশারুল আরিফের সমন্বয়ে চূড়ান্ত করা হয় চার্জশিট ।
চার্জশিটে সাইফুরকেই প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে আসামি করা হয়েছে- শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, মো. রবিউল হাসান ও মাহফুজুর রহমান মাসুমকে। আর আইনুদ্দিন ও মিসবাউল ইসলাম রাজনকে ধর্ষণে সহযোগিতার জন্য আসামি করা হয়েছে।তাদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া ৮ আসামির বিরুদ্ধে একই সঙ্গে প্যানেল কোডের ৩৪২/৩২৩/৩৭৯/৩৮৫/৩৪ ধারা অনুযায়ী আরো একটি অভিযোগপত্র দেয়া হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, বাদী ও ভিকটিমসহ অন্য সাক্ষী ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং ডিএনএ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অভিযোগ পত্র তৈরী করা হয়েছে। ঘটনার পর এমসি ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামায়ও অভিযোগপত্র দেয়া হয়।
এর আগে গত ৩০ নভেম্বর ধর্ষণের ঘটনার ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এসে পৌঁছে। ডিএনএ প্রতিবেদনে ধর্ষণের সাথে সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্করের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্ষণের ঘটনায় এই চারজন সহ ৮ জন জেলহাজতে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী । করোনার কারণে বন্ধ থাকা ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে ওই রেখে তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। এরপর তাদের মারধর করে টাকাপয়সাও ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। ওই রাতেই নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে নগরীর শাহপরান থানায় মামলা করেন। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। জনমতের চাপ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণবিরোধী আইনও সংশোধন করে সরকার।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে নববিবাহিত স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নগরের দক্ষিণ সুরমার জৈনপুর এলাকার এক যুবক। ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে টিলাগড়ে এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে থামেন তারা। এসময় কয়েকজন তরুণ এসে ওই যুবকের স্ত্রীকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে প্রাইভেটকারসহ ওই যুবককে সস্ত্রীক বালুচরে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যান তরুণরা। এরপর যুবককে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে প্রাইভেটকারের মধ্যেই ধর্ষণ করেন ৫/৬ জন। পরে এই দম্পতিকে মারধর করে তাদের কাছে থাকা টাকাপয়সা, স্বর্ণালাকার ছিনিয়ে নেন ধর্ষকরা। আটকে রাখেন প্রাইভেটকারও। ছাত্রাবাস থেকে ছাড়া পেয়ে টিলাগড় পয়েন্টে এসে পুলিশকে ফোন করেন নির্যাতিতার স্বামী। পরে পুলিশ গিয়ে ছাত্রাবাস থেকে ওই দম্পতির প্রাইভেটকার উদ্ধার করে এবং নির্যাতিতা তরুণীকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান অভিযুক্তরা। ওই রাতেই ৬ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামি করে শাহপরান থানায় মামলা দায়ের করেন নির্যাতিতার স্বামী। আর সোয়াশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। দায়ীদের বিচার ও নারী নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ।
এ ঘটনায় ৬ জনকে আসামি করে এসএমপির শাহপরাণ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্যাতিত ওই তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলায় আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমকে (২৫)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও ঘটনার ৩ দিনের মধ্যে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, মাহবুবুর রহমান রনি, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম এবং সন্দেহভাজন আসামি মিসবাউর রহমান রাজন ও আইনুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোনো পদে না থাকলেও গ্রেপ্তার হওয়া সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে।
গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে সকলেই ধর্ষণের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
এদিকে, ধর্ষণের রাতে এমসি কলেজে ছাত্রবাসে সাইফুর রহমানের দখলে থাকা কক্ষে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে সাইফুরের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করে। সেই মামলার অভিযোগপত্রও এখনও দেওয়া হয়নি।
অপরদিকে গণধর্ষণের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও মহি উদ্দিন শামিম গঠিত বেঞ্চে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গণধর্ষণের এ ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ২৬ অক্টোবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও কলেজের অধ্যক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দোহাই দিয়ে কলেজ কমিটির এ প্রতিবেদনটি সিলগালা করে রাখেন।
তাছাড়া গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব এবং সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন, সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসান।
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি